সম্ভাব্য করোনা থেকে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশী একদল গবেষকের গল্প!

বাকৃবি প্রতিনিধিঃ

এটি কোন কাল্পনিক বা রূপকথার গল্প নয়। সম্প্রতি সম্ভাব্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে একদল গবেষক কিভাবে রেহাই পেলেন তা নিয়ে অভিজ্ঞতার গল্প।গবেষকদলের প্রধান হঠাৎ করে যখন করোনার মত উপসর্গ বুঝতে পারলেন, দেরি না করে শুরু করলেন নিজস্ব পদ্ধতিতে এক অভিনব চিকিৎসা। তিনি জানতেন করোনা বা শ্বাসতন্ত্রের অন্য যে কোন ভাইরাসই হোক শুরুতেই সেগুলো গলায় বাসা বাঁধে। তাই তিনি দেরি না করে ভাইরাস কিভাবে সরাসরি গলায় বা শ্বাসনালীতে মারা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করে দিলেন। শ্বাসকষ্ট বেশী হওয়ার আগেই তিনি প্রয়োগ করলেন তার নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি। গবেষণাগারে গিয়ে দ্রুত তৈরি করে ফেললেন ৬০% ইথানলেন দ্রবণ। হ্যাঁ ইথানল বা ইথাইল এলকোহল যা জীববিজ্ঞানের গবেষণাগারে জীবানুমুক্ত করতে ব্যবহার করা হয়। আর এটি সেই এলকোহল যা বিনোদনমূলক বিভিন্ন পানীয়তেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে যাকে ড্রিংকিং এলকোহলও বলে।। তিনি সাহস করে ৬০% পানিয় দ্রবন দিয়ে দিনে ৩/৪ বার গলা গারগেল (কুলকুচি/গড়গড়া) করে নিতেন এবং ফুসফুসের ভিতরে কোন ভাইরাস ডুকে থাকলে তা মারতে প্রশ্বাসের সাথে এই এলকোহলের বাষ্প গ্রহণ করতেন। এতে দুদিনেই তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠেন।

বর্তমানে সাধারন সর্দি-জ্বর এর পাশাপাশি কোভিড-১৯ দ্বারা আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক লোক আক্রান্ত হলেও অনেকে এখনো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের মত এ দেশের মানুষও আজ কোভিড-১৯ এর কাছে বড় অসহায় কারণ এর কোন সঠিক চিকিৎসা বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। ঋতু বদলের ইঙ্গিতেও সেটা বেশ স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। আচমকা তাপমাত্রার হেরফের হলেই সর্দি-কাশির মত একটা সমস্যায় ভুগে থাকি আমরা। এগুলো মাথায় রেখে নিজের অভিজ্ঞতা ও গবেষনাগারে সক্ষমতা দিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এবং হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মোঃ আলিমুল ইসলাম এর নেতৃত্বে এক দল গবেষক (পিএইচডি শিক্ষার্থী ডাঃ মোঃ আসির উদ্দিন, ডাঃ মোঃ মুখলেছুর রহমান ও ডাঃ মোঃ এনামুল হক) আবিষ্কার করেন এই চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ভাইরাল জ্বর বা কোভিড-১৯ এর লক্ষণ শুরু হওয়া ব্যাক্তিদের আরোগ্যের জন্য একটি কার্যকরী উপায় বলে মনে করেন তারা।

এই পদ্ধতি গবেষকদলেন প্রধান তাঁর নিজের উপর, বিভাগীয় কয়েকজন শিক্ষানবীশ গবেষক ও কাজের বুয়ার উপর পরীক্ষা করে একই ফলাফল পেয়েছেন বলে তিনি জানান। সবাই সম্ভাব্য করোনা বা মৌসুমি জ্বরে ভুগতেছিলেন বলেও জানান তিনি।

গবেষকদলের প্রধান আলিমুল ইসলাম বলেন “আমাদের শরীর যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মিউকাস বা শ্লেষ্মা তৈরি করে, তখনই বাড়তি মিউকাস নাক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সেটাকেই আমরা বলে থাকি “নাক দিয়ে পানি পড়া’’ যা সাধারন সর্দি-জ্বরেও হয় আবার কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও তা হয়ে থাকে । প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারন সর্দি- জ্বর থেকে কোভিড-১৯ কে পার্থক্য করা বেশ কঠিন। তাই আমরা মনে করি, রোগের প্রাথমিক স্তরে যদি এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় তাহলে সাধারন সর্দি-জ্বর, কাশি এমনকি কোভিড-১৯ এর মত প্রাথমিক লক্ষণ থেকে খারাপ পর্যায়ে যাওয়ার পূর্বেই সহজেই মুক্তি পেতে পারি।”

কারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- জ্বর, গুরুতর গলা ব্যথা, নাক দিয়ে সর্দি পড়া, নাকে জ্বালা-পোড়া করা এবং মাথা ব্যথার রোগীরা (মৌসুমী ফ্লু বা কোভিড-১৯ এর লক্ষণগুলোর প্রাথমিক প্রকাশ) যাদের বয়স ১২ বছরেরে উর্ধ্বে তারা এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন।

কিভাবে ইথানলের দ্রবন তৈরি করে ব্যবহার করতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-

প্রথমে ৬০% ইথানলের দ্রবণ তৈরি করে তা সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার বোতলে ৩ কাপ খাঁটি ইথানল (ইথাইল অ্যালকোহল ৯৯.৯%) এর সাথে ২ কাপ পানি মিশিয়ে শিশুদের নাগালের বাহিরে রাখতে হবে।

একটি চায়ের কাপে অথবা একটি ছোট আকারের মগে ৬০ মিলি (১২ চা চমচ) ফুটন্ত গরম পানি ঢালতে হবে তারপর এতে অ্যাসিটোন ফ্রি খাঁটি ৪০ মিলি (৮ চা চামচ) ইথানল (ইথাইল অ্যালকোহল ৯৯.৯%) ঢেলে ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট পর্যন্ত নাক দিয়ে ঐ বাষ্প টানতে হবে। এ পদ্ধতিটি অবলম্বন করে শ্বাসনালী ও ফুসফুসে অবস্থানরত ভাইরাস মারা যাবে।

ইথানল বাষ্প টানার ঠিক ১০-১৫ মিনিট পর পরিস্কার একটি চায়ের কাপে অর্ধেক কুসুম গরম পানি ও বাকি অর্ধেক তৈরিকৃত ৬০% ইথানল মিশিয়ে সবটুকু (৫০ মিলি বা ১০ চা চামচ) দিয়ে ৩০ সেকেন্ড করে ২ বার কুলকুচি/গড়গড়া করতে হবে। এভাবে দিনে ৩-৪ বার করতে হবে। প্রতিবার কুলকুচি করার ৪-৫ মিনিট পর সাধারণ পানি দিয়ে হাল্কা কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে ১ম কুলকুচিতে মিউকাস বা শ্লেষ্মা পরিষ্কার হয়ে যাবে দ্বিতীয়বার কুলকুচিতে জীবানু মারা যাবে।

কুলকুচি করার পর তা নির্দিষ্ট কোন পাত্রে বা স্থানে ফেলতে হবে যেখানে ১% ব্লিচিং পাউডার রাখা আছে। কারণ গলা থেকে ভাইরাস কুলকুচির মাধ্যমে যাতে অন্যত্র ছড়িয়ে না যায় সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কোন কারনে পেটে গেলে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই কারন এটি ড্রিংকিং এলকোহল (হুইসকি, ভদকা, র্যা ম ইত্যাদি নেশাজাতীয় পানীয়তে ৩০-৪০% পর্যন্ত ইথানল ব্যবহার করা হয়)। সম্ভব হলে সাথে সাথে কিছু পানি পান করা যেতে পারে।এছাড়া যে মাত্রায় ব্যবহার করা হবে তা স্বল্প সময়ের জন্য মোটেও ক্ষতিকারক নয়। তবে কোন অবস্থাতেই মিথানল ব্যবহার করা যাবে না।

এছাড়া প্রতি ১ থেকে ২ ঘন্টার ব্যবধানে ৩ থেকে ৪ দিনের জন্য আদা ও দারুচিনি মিশ্রিত গরম পানি পান করা যেতে পারে। যে সব খাবার বা ফলমুলে এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে যেমন লেবু, কমলা, মাল্টা এগুলো প্রতিদিন খেতে পারলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।

এই পদ্ধতিতে ভাইরাস কিভাবে মারা যায় তার বৈজ্ঞানীক ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন-

এতে সব ধরনের ভাইরাস মারা যাবে। এমনকি কোষের সাথে লেগে থাকা ভাইরাসের চর্বির আবরন (লিপিড এনভেলোপ) ভেঙ্গে দিয়ে এবং আমিষ রিসেপ্টর বা এনজাইম সহ সবকিছু নষ্ট করে দিয়ে ভাইরাসকে মেরে ফেলবে। এছাড়া কোষের ভিতরে থাকা ভাইরাসও মারা যাবে। এলকোহলের পানির প্রতি আকর্ষণ থাকায় তার সংষ্পর্শে আসা কোষগুলো থেকে পানি বের করে নিয়ে শুষ্ক করে ফেলবে এবং ভাইরাসসহ কোষটি মারা যাবে। ভাইরাস ১-২ মিনিট এর মধ্যে সহজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ উভয় পদ্ধতি ব্যবহারে গলা ও শ্বাসতন্ত্রের পর্দার সঙ্গে লেগে থাকা সকল মুক্ত বা ভাসমান ভাইরাস স্বল্প সময়ের মধ্যেই ধ্বংস হবে।

এছাড়া প্রদাহজনিত কারণে (গলা ব্যথার ক্ষেত্রে) আক্রান্ত জায়গার কোষগুলো থেকে সাময়িকভাবে জলীয় পদার্থ শোষণ করলে প্রদাহ কমে যাবে এবং ব্যথা দ্রুত কমাতে সাহায্য করবে। সেই ক্ষেত্রে রোগীরা ভীষণ আরাম বোধ করবে। যদি ১-২ দিন কুলকুচি করলেই ব্যথা চলে যায় তাহলে আর কুলকুচি করার প্রয়োজন নেই। তবে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে ২ দিনে ব্যথা না কমলে আরও ১-২ দিন করাই ভালো।

এই এলকোহল খেলেও কি চলবে এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আলিমুল বলেন খেলে কাজ হবে না কারণ এই ভাইরাস গলায় ও শ্বাসযন্ত্রে থাকে । তাই ১-২ মিনিট সময় নিয়ে কুলকুচি করতে হবে যাতে ভাইরাস সম্পূর্ণরূপে মারা যায়।

সাধারন মানুষ এই এলকোহলের কিভাবে পাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-

ইথানল মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় মাদক নিয়ন্ত্রন আইনের কারনে এটি সহজলভ্য নয়। গবেষণাগার ও ঔষধ কোম্পানিতে এগুলো সাধারণত ব্যবহার করা হয়ে থাকে । সরকারী বা বেসরকারী উদ্দ্যেগে হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে ডাক্তারদের সহযোগিতায় এটি প্রথমে অল্প পরিসরে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে এবং হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসায় এটি বিভিন্ন মাত্রায় তৈরি করে সরবরাহ করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষ ডাক্তারের চিকিৎসাপত্র সাপেক্ষে ডিলারদের কাছ থেকে এই এসিটন ফ্রি ইথানল সংগ্রহ করতে পারে।

উল্লেখ্য মানবদেহের ভিতরে ইথানল ব্যবহার করে জীবানু ধ্বংস করার পদ্ধতি নতুন কিছু নয়। আমরা সচারচর যে এন্টিসেপ্টিক মাউথওয়াশ ব্যবহার করি তাতে ইথানল থাকে। আবার এটি নতুন কোন আবিষ্কারও নয়। জাপান এবং আমেরিকায় একই ধরনের গবেষণায় (নিচে লিংক দেয়া আছে) ভাল ফল পাওয়া গেছে যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণাকে সমর্থন করে।

জাপানে গবেষনার কাজটি দেখুন এখানে

আমেরিকায় পরীক্ষার ফলাফল দেখুন এখানে

  •  
  •  
  •  
  •