ঝিনাইদহে করোনা এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের জীপে চড়ে!

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহঃ

ঝিনাইদহে মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়ন। সেনাবাহিনীর বিরামহীন টহল। গ্রাম এলাকায় ৩৪ টি পুলিশ ক্যাম্পের তৎপরতা। সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কঠোর পাহারা। বিদেশ ফেরত মানুষের ওপর কড়া নজদারি। ঝিনাইদহ জেলা করোনা মুক্ত মর্মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস ব্রিফিং। সব মিলিয়ে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন ফুরফুরে মেজাজে। সাধারণ মানুষের মাঝেও ছিল শান্তি এখন গোটা জেলায় করোনা ছড়িয়ে পোড়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ ডাক্তার নার্স এবং স্বাস্থ্য কর্মি। কেউ কেউ কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। অনেকে স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। ইতিমধ্যে জেলার শৈলকুপা ও কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে জেলার চিকিৎসা সেবা। নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সেই রকম একটি খবর।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে ঝিনাইদহে ২৫ এপ্রিল শনিবার প্রথম ২জন করোনা রোগী সনাক্ত করা হয়। এদের ১ জন ঝিনাইদহ জেলা শহরের পাগলাকানাই সড়কের বাসিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষিকা এবং অপর জন কালীগঞ্জ উপজেলার মোল্লাডাঙ্গা গ্রামের এক দিনমুজুর। এদিন ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যায় ১৪ বছর বছরের এক শিশু। এঘটনার পরেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঝিনাইদহ জেলা করোনা মুক্ত বলে দাবি করে অনলাইনে প্রেস ব্রিফিং করে। এতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

২৬ এপ্রির ৯ জন, ২৭ এপ্রিল ৪ জন, ২৮ এপ্রিল আরো ৮ জন করোনা রোগী সনাক্ত করা হয়। জেলার ২১ জন করোনা আক্রান্তের মধ্যে ১৩ জন ডাক্তার, নার্স, ড্রাইভার রাধুনীসহ স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন। বিলাশ বহুল দামি জীপে চোড়ে শৈলকুপা ও জেলা শহরে করোনা এসেছে মর্মে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। জানা যায়, সারা দেশ করোনা ঝুঁকি ঘোষণা করার পরেও থেমে থাকেনি স্বাস্থ্য বিভাগের নতুন জীপ হস্তান্তরের কার্যক্রম। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের জন্য কেনা হয়েছে আধুনিক দামি জীপ গাড়ি। কিছু দিন আগের এ জেলার ৩ উপজেলাতে সেই জীপ দেওয়া হয়েছে। বাকি ছিল শৈলকুপা, মহেশপুর এবং ঝিনাইদহ সদর উপজেলা । এ গুলো হলো স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ। ৩টি জীপ ঢাকা থেকে আনার জন্য কেন্দ্রীয় ঔষুধ ভান্ডার থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই জীপের একটিতে চড়তে আসা করোনা আক্রান্ত নারী থেকে শৈলকুপা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সদর পৌর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯ এপ্রির দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে একটি মাইক্রোবাস ও একটি প্রাইভেট কার স্থানীয় আরিফ ফিলিং স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঝিনাইদহ-চ’১১-০০০৩ নং মাইক্রোটি ঝিনাইদহ ভেটিরিনারী কলেজের। এর চালক ছিলেন আব্দুল আলীম। সে জানায়, মাইক্রোতে যাত্রী ছিলেন, ঝিনাইদহ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডাক্তার সাজ্জাদ হোসেন, তার দপ্তরের আউট সোর্সিং গাড়ি চালক কানু বিশ্বাস এবং তার বড় ভাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গাড়ি চালক বাদশা বিশ্বাস, মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাঃ আকবার নেওয়াজ এবং আউট সোর্সিং ড্রাইভার তারা মিয়া।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রাশেদ আল মামুনের দেওয়া তথ্য মতে প্রাইভেট কারে চড়ে যান তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালক সোহেল রানা, স্টোর কিপার মাসুদ রানা, আউট সোর্সিং ড্রাইভার অহিদ সাদিক উজ্জল এবং ডাক্তার আকাশ আহম্মেদ আলিফ। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আউট সোর্সিং গাড়ি চালক কানু বিশ্বাস বলেন, ২০ এপ্রিল সকাল অনুমান সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রী ঔষুধ ভান্ডারে পৌঁছান তারা। একই দিন রাত অনুমান ৯ টার দিকে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাসহ ঝিনাইদহে ফিরে আসেন তারা ৩ জন। তার দেওয়া তথ্য মতে অন্য দুইটি নতুন জীপ এবং ভেটেরিনারি কলেজের মাইক্রোটি আলাদা ভাবে ঢাকা ত্যাগ করে। পরে সে জানতে পারে শৈলকুপার জন্য বরাদ্দ দেওয়া নতুন জীপে করোনা আক্রান্ত একজন নারী যাত্রী ও তার স্বামীকে বহণকরা হয়েছে।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রাশেদ আল মামুন দাবি করেছেন, করোনা রোগী বহনের খবর সঠিক নয়। তবে জীপের ড্রাইভারসহ সব যাত্রী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন মর্মে স্বীকার করেন তিনি। এ কর্মকর্তার ভাষায় নতুন জীপে করোনা রোগী নয় ব্যাগপত্র বহণ করা হযৈছে। ওই নারীর রোগীর স্বামী তার দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিসংখ্যানবিদ বখতিয়ারের নিকট আত্মীয় বলে স্বীকার করেছেন তিনি। ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডাঃ সেলিনা বেগম নতুন জীপে করোনা রোগী বহন করার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও জানান।

পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান বলেছেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে গোয়েন্দারা কাজ শুরু করেছেন। জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ বলেছেন, আগাম প্রস্তুতি গ্রহন করার ফলে করোনার ঝুঁকির বাইরে ছিলেন এ জেলার মানুষ। এখন সব হিসেব পাল্টে গেছে। তিনি আরো বলেছেন, শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ করা জীপে করোনা আক্রান্ত নারী স্কুল শিক্ষককে বহন করা হয়েছে মর্মে নিশ্চিত হওয়া গেছে। চলমান পরিস্থিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সন্ধান করে দ্রুত হোম কোয়ারেন্টিন করার পরার্মশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

  •  
  •  
  •  
  •