এখনো কিছু জানা বাকি সেফটি ট্রায়ালে ভ্যাকসিন সর্ম্পকে

নিউজ ডেস্কঃ

গত কিছুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা দ্রুতগতিতে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছেন। এরই মধ্যে মানুষের শরীরের প্রথম ট্রায়ালের ফলও প্রকাশ করা হয়েছে।

এই ফল আসে চারটি প্রতিশ্রুতিশীল ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল থেকে এবং ভ্যাকসিন গ্রহণের ফলে কীভাবে মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে সেই ডাটা থেকে। কারণ এই ট্রায়াল মনোযোগ দেয় সুরক্ষা ও ডোজিংয়ের ওপর। ডাটা বলতে পারে না ভ্যাকসিন রোগ কিংবা সংক্রমণ রোধ করতে পারবে কিনা, সে জন্য বড় আকারে কার্যকর ট্রায়ালের প্রয়োজন আছে। তবে তারা যে পরামর্শ দেয় তা হলো এই ভ্যাকসিন বিস্তৃতভাবে নিরাপদ। সে সঙ্গে তারা আরো বলে, এই ভ্যাকসিন প্রথম ইঙ্গিত দেয় যে এটি সংক্রমিত ব্যক্তিদের অনুরূপ একটি ইমিউন প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, গবেষকরা বলেছেন ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ট্রায়ালে টেস্টিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো ডাটা পাওয়া গেছে, যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা ভ্যাকসিন বা প্লাসাবো গ্রহণ করেছেন এবং দুটি গ্রুপের মাঝে কভিড-১৯ রোগের হারের তুলনা করা হয়েছে।

ভ্যাকসিন ইমিউনোলজিস্ট শেন ক্রোটি বলেন, আমি খুবই আনন্দিত যে আমার প্রথম ধাপের ট্রায়ালের বাইরেও বৈচিত্র্যময় ভ্যাকসিন কৌশল আছে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা ফলগুলো নিয়ে বাড়াবাড়িভাবে ব্যাখ্যা করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন, বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিনের ব্যবহার করার জন্য ডাটাগুলো সরাসরি ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে চূড়ান্তভাবে এ ধরনের তুলনা বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন কীভাবে কাজ করে বা কেন সেগুলো ব্যর্থ তা নির্ণয় করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে অন্যান্য ভ্যাকসিনকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য এবং নতুন কোনোটি আবিষ্কার করার জন্য এটি ব্যবহূত হয়। কিন্তু গবেষকরা এখনো ইমিউন প্রতিক্রিয়ার সঠিক প্রকৃতি জানেন না, যা কিনা কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দেবে। এখানে সংক্রমণ প্রতিরোধের একাধিক উপায় থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ল্যাবে একটি দলের তৈরি করা বিভিন্ন ইমিউন মার্কারের পরিমাপ অন্য একটি দলের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।

ইমোরি ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট রাফি আহমেদ বলেন, এই ডাটা খুবই প্রাথমিক। এ পর্যায়ে একটা ব্যাপার বলা আমাদের এড়িয়ে যেতে হবে যে কোনটা ভালো। কারণ আমরা এখনো জানি না।

ভাইরাল ভেক্টর

চারটি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা বলেছেন, তাদের ভ্যাকসিন মানুষের মাঝে কিছু ইমিউন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে, যা কিনা বিস্তৃতভাবে সেরে ওঠা রোগীদের মাঝে দেখা যায়। ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীরা অন্যান্য ভ্যাকসিনের মতো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, যেমন পেশিতে ব্যথা, জ্বর ও মাথাব্যথা। খুব অল্প অংশগ্রহণকারীদের মাঝেই বিভিন্ন ভ্যাকসিনের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোর্টি বলেন, বেশির ভাগকেই বেশ নিরাপদ বলে মনে হচ্ছিল।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির দুটি দল অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ক্যাসিনো বায়োলজিসের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ভাইরাল ভেক্টর’ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ করছে, যারা তাদের ফল প্রকাশ করেছে ২০ জুলাই।

২০ জুলাই ফল ঘোষণার সময় অক্সফোর্ডে ভ্যাকসিনোলজিস্ট সারাহ গিলবার্ট বলেন, ভ্যাকসিনটি যে ধরনের ইমিউন প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তোলে তা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় বলে আমরা মনে করি।

ইমিউন প্রতিক্রিয়া

সর্বশেষ ডাটা ভ্যাকসিন দ্বারা উৎসাহিত ইমিউন প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি সম্পর্কে সর্বোত্তম অন্তর্দৃষ্টি দেয়। এটি কার্যকর ট্রায়ালের একমাত্র ইঙ্গিত, যা সম্ভবত কাজ করবে।

ভ্যাকসিন ভাইরাসের উপাদানগুলোতে বিশেষ করে স্পাইক প্রোটিনের বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেমকে উন্মোচন করার মাধ্যমে কাজ করে। কভিড-১৯-এর প্রায় সব ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এটা দেখা যায়। এটা করা হয় ভবিষ্যতে সত্যিকার সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াকে প্ররোচিত করার আশায়। এই ট্রায়ালগুলো বিস্তৃতভাবে দুই ধরনের ইমিউন প্রতিক্রিয়ার খোঁজ করে: শরীরের দ্বারা তৈরি অ্যান্টিবডি অণুগুলো যা কিনা চিনতে পারে এবং আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাইরাল কণা নিষ্ক্রিয় করতে পারে। আর অন্যটি হলো টি-সেল, যা কিনা সংক্রমিত সেলকে হত্যা করার পাশাপাশি অ্যান্টিবডি উৎপাদনসহ ইমিউন প্রতিক্রিয়াকে উৎসাহিত করে।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া হয়েছে রক্তে সঞ্চালিত ‘অ্যান্টিবডিকে নিউট্রোলাইজিং’ করার দিকে, যা কিনা ভাইরাল কণাগুলোকে অসংক্রমিত করতে পারে। রাফি আহমেদ বলেন, এসব ভ্যাকসিন কিছু অ্যান্টিবডিকে প্ররোচিত করে যা কিনা নিরপেক্ষ, যা কিনা অনিরেপক্ষ হওয়ার চেয়ে ভালো। এটি বেশ ভালো চিহ্ন। বেশির ভাগ ভ্যাকসিন স্বেচ্ছাসেবী এই শক্তিশালী অ্যান্টিবডি স্তর তৈরি করেছে, যা কিনা কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

কিন্তু এসব ভ্যাকসিনের অনেকগুলোর প্রতিক্রিয়ার জন্য একের অধিক ডোজ প্রয়োজন। ভ্যাকসিন বিজ্ঞানী পিটার হোটেজ বলেন, আমি মনে করি, ভাইরাসকে নির্মূল করতে পর্যাপ্ত নিউট্রোলাইজিং অ্যান্টিবডি পেতে, অনেক ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে দুটি ডোজ প্রয়োজন হতে পারে।

টি-সেল ফোকাস

ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকদের কাছে টি-সেলের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে কম মনোযোগ পায়। এটি পরিমাপ করাও কঠিন। বিশেষত ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা কয়েক হাজারে ঠেলে দেয়। কোর্টি বলেন, প্রাকৃতিক সংক্রমণের সামনে আসা ডাটা বলছে, টি-সেল সম্ভবত করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বেশির ভাগ ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের টি-সেল প্রতিক্রিয়ার বিভিন্ন মাত্রা শনাক্ত করে। কোর্টির দল স্পাইক চিহ্নিতকারী সিডি৮ টি-সেল শনাক্ত করেছে, যা কিনা অ্যান্টিবডি উৎপাদনে সাহায্য করেছে, যা তারা পুনরুদ্ধার করেছে সেরে ওঠা ১০ জন রোগীর মাঝে। ৭০ ভাগের সিডি৮ টি-সেলও ছিল, যা স্পাইকের বিপরীতে ভাইরাস সংক্রমিত কোষকে হত্যা করে।

এ জাতীয় ডাটা সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা কিনা শুরুর দিকের ট্রায়ালের ফলাফলগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে সহজবোধ্য করতে পারে। তবে এ ধরনের তুলনা ব্যর্থ হতে পারে পরিবর্তনশীল প্রকৃতির টেস্টের কারণে, যা গবেষকরা ব্যবহার করেন অ্যান্টিবডি নিউট্রোলাইজিং এবং টি-সেলের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করতে। আবার একই পরীক্ষা বিভিন্ন পরীক্ষাগারে বা সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে করা হলে তা আলাদা আলাদা মান নিয়ে ফিরে আসতে পারে।

  •  
  •  
  •  
  •