বাকৃবির গণরুম থেকে বলছি

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ভর্তিপ্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আরো একটি ব্যাচের সিনিয়র হয়ে যাচ্ছি। আজ কিছু কথা না জানিয়ে থাকতে পারছিনা। দয়া করে লিখাটা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য না করে আবেদনটা বোঝার চেষ্টা করবেন সবাই। ভুলত্রুটি অবশ্যই ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।

আমরা ২০১৪/১৫ সেশন, বর্তমানে লেভেল-০২, সেমিস্টার-০২ এর শেষ পর্যায়ে। আজ দুই বছর যাবৎ আমরা একদল সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে গণরুমে থাকি। তিনটা গণরুমে প্রায় ২৭০ জন ছিলাম আমরা। একটু বিস্তারিত বলার জন্য আমার নিজের গণরুম-১ এ কাটানো দুই বছরের কিছু কথা আলোকপাত করছি।

৩৬টা বেডে আমরা ৭২জন মেয়ে ছিলাম প্রায় একবছর, ডাবলিং করে (এখন এক বেডে একজনই)। কোন পড়ার টেবিল তো দূরের কথা, জিনিসপত্র রাখার জন্য যে একটা রেক লাগে মানুষের, সে জায়গাটুকুও এই ঘিঞ্চি রুমটাতে নেই। একটা ছোট্ট বেডে কাপড়, বই, শীট রেখে দুইজন মানুষ যে কিভাবে একসাথে ঘুমাতে পারে এবং এত্তটা দীর্ঘ সময় পার করতে পারে, তা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন সাধারণ রুমে থাকা ছাত্র কিংবা শিক্ষক কারোরই বোঝার কথা নয়। ৭২জন মেয়ের স্বভাব ৭২রকম। কারো গরম লাগে তো,কারো শীত, কেউ আড্ডা দেয় তো, কেউ রোগগ্রস্থ হয়ে শব্দে ঘুমাতে পারেনা, কারো পরীক্ষা থাকে, তো কারো থাকে জন্মদিনের পার্টি। সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অস্বস্তিকর পরিবেশে অমানবিক দিন কেটেছে আমাদের। তারপর আবার বাথরুম সমস্যা, চুলা সমস্যা, বিদ্যুৎ সাপ্লাই সমস্যা। কোন বেসিন নেই আমাদের।

গনরুমের মেয়েদের ফ্যান লাইট নষ্ট হলে তা ঠিকও করে দেয়া হতো না। বাথরুমের দরজা ভেঙে গেলেও ওরকম ভাঙাই পড়ে থাকতো মাসের পর মাস। আমাদের জন্য রাইস কুকার ব্যবহার নিষেধ। আধ মগ জল গরম করতে চাইলেও আপুদের ব্লকে দৌড়াতে হয়। যেখানে ডাইনিং এর খাবারের মতো অরুচিকর খাবারই হয়না, সেখানে আমাদের জন্য ব্লকে রান্না করতে যাওয়াও নিষেধ। কারণ ব্লকের চুলা ব্লকের মেম্বারদের জন্য, গনরুমের প্রাণীদের জন্য সবই নিষেধ। চুরি করে রাইস কুকার ইউজ করতে গিয়েও ধরা খেয়ে সে রাইসকুকার ফেরত নিতে পারেনি বান্ধবীরা। আমাদের হলের আপুসমাজে গণরুমকে বস্তির থেকেও নিকৃষ্ট স্থান বলে ধরা হয়,আর ‘গনরুমের মেয়’ একটা গালীগালাজের মতোই, যেখানেই বাথরুম নোংরা, বেসিন নষ্ট, সব নাকি গনরুমের আমরাই করি শুধু। এত্ত বেশি কঠিন আর জঘন্য সময়ের পায়ে পিষ্ট হয়ে দিন পার করছি আমরা,পড়াশুনার ন্যূনতম কোন পরিবেশ নেই এখানে। কোন রিডিং রুমও নেই হলে। বিড়াল, তেলাপোকায় জমজমাট গনরুমটা যে কত্তটা নোংরা, তা অন্তত স্ট্যাটাস লিখে বেঝানো সম্ভবনা!

এখন আসল কথাতে আসি, আমরা সকলে ভর্তি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়েই এসেছিলাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেধার জোরেই। প্রশাসন শুরুতেই বলেছিল, ৩ মাসের মধ্যে রুমে সীট দিবে কিংবা নতুন হলে যাবার ব্যবস্থা করবে। অথচ দুইবছরেও সীট পাইনি। আমাদের হলে মাস্টার্সের যেসব আপুরা চলে যান, সেসব সীটে কিছুসংখ্যক ছাত্রী উঠে পড়ে মেরিট অনুযায়ী। যদিও অনেক মেয়েই সিরিয়াল ব্রেক করে কেন আপুদের রিকমেন্ডেশনে আগেই উঠে পড়ে, কখনো এমনও হয়,যে মেয়েকে রুমে অ্যালটমেন্ট দেয়া হয়,সে যদি রুমটাত উঠতে চায়,তাকে উঠতে দেয়া হয়না। কারণ রুমের আপুরা পছন্দ করে মেয়ে উঠায় রুমে। কারো মানদন্ড চেহারা, কারো মানদন্ড ধর্ম, কারো মানদন্ড আর্থিক অবস্থা।

এইতো সেদিন পাঁচটা সীট ফাঁকা হলো, আমার ৫জন রুমমেট গেল রুমগুলি দেখতে,তাদের মধ্যে একজনকে সিলেক্ট করা হলো, বাকি চারজন ফিরে এলো। সীট ফাঁকা, অথচ আমাদের পড়ে থাকতে হবে গনরুমেই। মাস্টার্সের আপুরা থিসিস জমা দেয় না, পিছিয়ে দেয়। সে যাই ই হোক, অনেক রুমেই মেয়ে থাকেনা, হয়ত বিবাহিত কিংবা শহরে বাসা, তারও রুমে কাওকে নিবেনা বলে দেয়। প্রভোষ্ট স্যার শুধু আশ্বাসই দিয়ে আসলেন এ দুই বছর, আমাদের কোন সমাধান দিলেন না।

গত পনের দিন আগে নোটিশ এলো, প্রক্টর কার্যালয় থেকে, যারা যারা নতুন হলে যেতে ইচ্ছুক, তারা যেন আবেদনপত্র জমা দেই। এ কাজটা একবছর আগে করেছিলাম আমরা। কিন্তু আমাদেরকে নতুন হলে না পাঠিয়ে ১ম বর্ষকে পাঠানো হয়। কারণ ওরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিল। প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়েছিল। আমরা ২য় বর্ষরা বিশ্বাস রেখেছিলাম, আস্থা রেখেছিলাম প্রশাসনের উপর, কিন্তু প্রশাসন তাকায়নি এই অবহেলিত প্রাণীদের দিকে। প্রশাসন পারতো ১ম বর্ষকে গনরুমে দিয়ে আমাদেরকে নতুন হলে পাঠাতে, কিন্তু তা হয়নি।

কাল আরো নতুনরা অ্যাটাচমেন্ট পাবে এই হলে, শুনছি আমাদেরকে আবারো ডাবলিং থাকতে হতে পারে, কিংবা নতুন হলে গুটিকতক ছাত্রীকে পাঠানো হতে পারে (৩০জনকে)। জানিনা, আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা ঠিক কত্তটা বড় অপরাধ ছিল! চারপাশে যেখানে সব মেয়েরা পড়ার টেবিলে মেরুদন্ড সোজা করে পড়ে,আমরা হাড্ডিগুড্ডি দলা পাকিয়ে পড়ার চেষ্টাতে নিমগ্ন,যেখানে অন্যরা ফিস্ট করে, শাড়ি পড়ে উল্লাস করে, সেখানে গনরুমের আমরা বিড়ালময় নোংরা রুমে কুৎসিত সময় কাটাই, এসি রুমে বসে থাকা প্রশাসন এই নিঃশ্বেষ প্রাণের হাহাকার বুঝবেনা কখনো, উন্নয়নের মহাসমারোহে নিমজ্জিত থাকা এগিয়ে চলা কৃষিবীদ জাতিরা হয়তো ভেবেই নিয়েছে, এই গনরুমের মেয়েদের থেকে কোন বিসিএস ক্যাডার, সাইন্টিফিক অফিসার, লেকচারার জন্মাবেনা কোনদিন, এই গনরুমের মেয়েদের তাই কোন সুস্থ জীবনের দরকার নেই, গতিময়তার দরকার নেই, একটা সামান্য পড়ার টেবিল, দরকার নেই রান্নার ব্যবস্থা আর ঘুমানোর জায়গার।

সত্যিই, আমরা ‘গণরুমের মেয়েরা’ হয়তো সত্যিই মানুষই নই। আমরা তো গণরুমের মেয়ে!

_____________________________
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

.

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সবুজবাংলাদেশ24.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে সবুজবাংলাদেশ24.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

Comments

comments