ছাই থেকে সোনা তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করছে ৭০০ পরিবার (ভিডিও)

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি:
‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো মানিক ও রতন’, কবির এই কবিতাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রাম ও গোবিন্দল ইউনিয়নের শত শত পরিবার। বংশপরম্পরায় এ কাজটি করছে তারা। ছাই থেকে সোনা! যদিও কাজটি অসম্ভব কিন্তু এ অসম্ভব কাজটি বাস্তবে সম্ভব করেছে তারা। চারিগ্রামের দাশারহাটি ও গোবিন্দল গ্রামে ছাই থেকে সোনা তৈরির কঠিন কাজটি প্রায় ১৫০ বছর ধরে করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, যা কিনা দেশের আর কোথাও হয় না। এই সোনা তৈরিকে কেন্দ্র করে চারিগ্রাম বাজারে সাপ্তাহিক সোনার হাটও বসে থাকে বলে জানা গেছে।

দাদার আমল থেকে সোনা তৈরির কাজে নিয়োজিত দাশারহাটি গ্রামের বদরউদ্দিন জানান, চারিগ্রাম ও গোবিন্দল গ্রামের ৩ হাজারের বেশি লোক এই ছাই থেকে সোনা তৈরির কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কাজ করেই এখানকার বেশিরভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে।

ছাই থেকে সোনা তৈরির গোপন রহস্যটি জানার জন্য কথা বলেছিলাম একই গ্রামের ফজল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বর্ণের দোকানের পরিত্যক্ত ছাই কিনে সেগুলোকে পোড়ানো হয়। তারপর সেই ছাই পুড়ে একপ্রকার ধুলায় রূপান্তরিত হয়। সেই মিহি ধুলার সঙ্গে সোহাগা, ব্যাটারির শিশা ও পুনট দিয়ে ছোট ছোট পিন্ডি বা দলা তৈরি করা হয়। তারপর রোদে শুকানো পিন্ডি আগুনে গলিয়ে পিস করা হয়। সেই পিস ঢেকিতে পাড় দিয়ে গুঁড়া করা হয়। তারপর মাটিতে গর্ত করে চুন ও ধানের তুষ দিয়ে পুড়িয়ে সিসা বের করা হয়। তারপর ছাকনি দিয়ে ছেঁকে পানিতে ধুয়ে সিসা আলাদা করা হয়। একটি পাত্রের মধ্যে নাইট্রিক এসিড দিয়ে সিসা আলাদা করে সোনা বের করা হয়।

সোনা তৈরির আরেক নিপুণ কারিগর মো. শহীদ জানান, আমরা ঢাকাসহ দেশের সব সোনার দোকান থেকে পরিত্যক্ত ছাই মাটি কিনে আনি। দোকানের আকার ভেদে এ মাটি আমরা ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা দিয়েও কিনে থাকি। এই ছাই মাটিতে ১ আনা থেকে শুরু করে ১০ ভরি পর্যন্ত সোনা পাওয়া যায়।

চারিগ্রামের পোদ্দার পট্টির স্বর্ণ ব্যবসায়ী কাজল জানান, এই এলাকাকে কেন্দ্র করে চারিগ্রাম বাজারে গড়ে উঠেছে একটি স্বর্ণের বাজার। এখানে প্রায় ৩০-৩৫টি স্বর্ণের দোকান আছে। ওদের তৈরি সোনা আমরা কিনে বিক্রি করে থাকি।

গোবিন্দল গ্রামের সোনার কারিগর শাজাহান জানান, কেমিক্যালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন লাভ খুব একটা হয় না। সোহাগা, ব্যাটারির ছাইয়ের দাম অনেক বেড়ে গেছে।

৪০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত ফারুক হোসেন জানান, পুলিশ খুব ঝামেলা করে। মাল কিনে আনার সময় তারা আমাদের নানাভাবে হয়রানি করে। টাকা না দিলে মাল আটকে দেয়।

চারিগ্রাম ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আফতাব উদ্দিন আহমেদ জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে এ এলাকায় ছাই থেকে সোনা বানানোর কাজটি করা হচ্ছে। স্বর্ণের দোকানের পরিত্যক্ত ছাই থেকে খুব পরিশ্রম করে কারিগররা সোনা বের করছে। তারা দেশের অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার সাপোর্ট দিচ্ছে অথচ তারা খুব একটা ভালো নেই। সরকার থেকে তারা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাল কিনে আনার সময় তাদের নানাভাবে হয়রানি করছে একশ্রেণীর অসাধু পুলিশ ও চাঁদাবাজরা। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ছাই থেকে সোনা খুঁজে বের করার মতো কষ্টসাধ্য কাজটি যারা নিপুণভাবে সমাপন করছেন প্রশাসনের কাছে তাদের শুধুই চাওয়া বংশপরম্পরার এ কাজটি যেন তারা সব রকমের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই করতে পারে এবং তারা চায় মানিকগঞ্জের এ শিল্পটি বেঁচে থাকুক হাজার বছর।

Comments

comments