বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় ‘নন্দিনী’

শেকৃবি প্রতিনিধি:
দিন দিন বাড়ছে দেশে ফুলের বাজার। বিদেশ থেকে নানা জাতের ফুল আমদানির পাশাপাশি বাড়ছে দেশে ফুলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ। দেশে সবচেয়ে বেশি ফুল চাষ হয় গোলাপের। একইসঙ্গে বিভিন্ন জাতের গোলাপ আমদানিও হয়। তবে গোলাপের চেয়ে বেশি লাভজনক হতে পারে নন্দিনী ফুলের চাষ। এই ফুলের ওপর ১৭ বছর গবেষণা করেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন। তিনি জানিয়েছেন, দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে নন্দিনী ফুল, বীজ ও চারা রফতানি করার সুযোগ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. জামাল উদ্দিন বলেন, নন্দিনী ফুলের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে হলেও এই ফুলের চাষ নিয়ে গবেষণা হয়েছে জাপানে। ফুলটির ইংরেজি নাম ‘লিসিয়েনথাস’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম ‘এস্টোমা গ্রান্ডিফ্লোরাম’। জাপানে ফুলটি ‘তরুকোগিকিও’ নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত, চীন, নেপাল, ভুটানে এই ফুলের চাহিদা বেশি। নন্দিনী দেখতে অনেকটা জারবেরা আর গোলাপের মাঝামাঝি। এই ফুল ৪৫টি রঙে দেখা যায়। একটি গাছে কমপক্ষে ৮০ থেকে ১২০টি ফুল ফোটে।

জামাল উদ্দিন বলেন, নন্দিনী ফুলের গাছ অনেক বেশি সহনশীল। ঝড়, বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগেও গাছ নষ্ট হয় না। সারা বছরই এই ফুল চাষ করা যায়। নন্দিনী ফুল গাছে ১৫ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। এ ছাড়া গাছ থেকে সংগ্রহ করে সুক্রোজ দিয়ে ফুলদানির পানিতে ২৫ দিন পর্যন্ত সতেজ রাখা যায়। এমনকি ফুলের সঙ্গে থাকা কলিগুলো ফুলদানিতেই ফোটে।

অধ্যাপক জামাল উদ্দিন প্রায় ১৭ বছর ধরে এই ফুল নিয়ে গবেষণা করেছেন। জাপানে এই ফুলের ওপর পিএইচডি করেন তিনি। সেখানেই এই ফুলের বীজ, চারা উৎপাদনসহ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। ২০০৪ সালে দেশে এসে নন্দিনীর চারা উৎপাদনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফের জাপান যান তিনি। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আবার জাপানে ফিরে গবেষণা করে সফল হন। দীর্ঘ গবেষণা শেষে জাপান থেকে বীজ নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। ফুলের বিচিত্র রঙয়ের কারণে এই ফুলের নাম ‘নন্দিনী’ রেখেছেন বলে জানান জামাল উদ্দিন। তিনি জানান, নন্দিনীর চাষ সহজ হলেও বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে হয় বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আলোতে একটি রুমে এই চারা উৎপাদন করতে হয়। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রক্রিয়ায় বীজ থেকে চারা উৎপাদন করে ফুল ফোটানো গেছে।

নন্দিনীর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা:
বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে অনেক ফুল আমদানি হয়। বাংলাদেশে নন্দিনী থাইল্যান্ড থেকে আসে ‘ইউস্টোমা’ বা ‘লিসিয়েন্থাস’ নামে। দীর্ঘদিন সতেজ থাকায় ফুলটির চাহিদা যেমন বেশি তেমনি দামও বেশি। ফুলটি বাংলাদেশের যে কোনও অঞ্চলে চাষ করা সম্ভব। দেখতে সুন্দর এবং সহজে চাষাবাদের কারণে গোলাপের বিকল্প হতে পারে এই ফুল। এ ছাড়াও ব্যাপক চাষাবাদের দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এই ফুল, বীজ ও চারা রফতানি করা সম্ভব।

ফুল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে উৎপাদিত ফুলের মধ্যে গোলাপ, রজনীগন্ধার চাহিদা বেশি। এই ফুলগুলো তিন থেকে ছয় দিন সতেজ থাকে।বিভিন্ন দেশ থেকে নানা জাতের ফুল দেশে আমদানি করা হয়। এক্ষেত্রে যেসব ফুল দীর্ঘদিন সতেজ থাকে সেই ফুল আমদানি করা হয় বেশি। ‘ইউস্টোমা’ নামের নন্দিনী থাইল্যান্ড ও চীন থেকে আসে। বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় বলে বিক্রি হয় ১২০ থেকে ২০০ টাকায়।

নন্দিনীর চাষ প্রসঙ্গে ড. জামাল উদ্দিন বলেন, শুধুমাত্র বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে হয় আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে। বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ দিন। বীজ থেকে চারা উৎপাদনে বিশেষ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হলেও গাছের পরিচর্যা সহজ। চারা লাগানোর ৬০ দিনের মধ্যে ফুল ফুটতে শুরু হয়। প্রতি ডালে গড়ে ১৫ থেকে ২৫টি ফুল ফোটে। দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মে এ ফুল। বাংলাদেশে বীজ থেকে চারা উৎপাদনে খরচ পড়বে প্রায় ২০ টাকা। ফুল উৎপাদন করে ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি করেও মুনাফা করতে পারবেন চাষীরা।

নন্দিনীর চাষাবাদ জনপ্রিয় করতে ফুল চাষীদের ও সাধারণ মানুষের রোপণের জন্য ১০ লাখ চারা বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন ড. জামাল উদ্দিন। এ ছাড়াও ২০ জন চাষীকে হাতে কলমে এই ফুল চাষের প্রশিক্ষণও দেবেন তিনি।

(Visited 4 times, 1 visits today)