কৃষিতে উচ্চশিক্ষা

রফিকুল ইসলামঃ

কৃষি, কৃষক আর কৃষিবিদ একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। আমাদের জাতীয় আয়ের সিংহভাগই আসে কৃষি থেকে। আমরা বাঁচার জন্য খাই। আর সেই খাবার উত্পাদন করতে এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যাদের তারা হলেন কৃষিবিদ ও কৃষকরা। কৃষিপ্রধান এদেশের ৮০-৮৫ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষির এতো গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কৃষিকে ঘিরে রয়েছে মানুষের অনীহা। অনেকের ধারণা, মাঠে ফসল উত্পাদন ও বিপণন, পুকুরে মাছ চাষ ও গবাদিপশু চিকিত্সা ও প্রতিপালনই কেবল কৃষি— এটা আবার উচ্চশিক্ষার কোনো বিষয় হতে পারে নাকি? তবে দিন বদলেছে। সময়ের সাথে মানুষের চিন্তা-চেতনারও পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ছিল যখন কৃষিকে নিয়ে শুধু কৃষিবিদরাই ভাবতেন। এখন সচেতন মানুষরাও ভাবছেন কৃষিকে ঘিরে। দিনের পালাবদলে এই যুগে কৃষি খাতেই রয়েছে উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের হাতছানি।

কৃষিবিদ হতে চাইলে…

কৃষিবিদ হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা করতে হবে। পরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন অনুষদেও চার বছরমেয়াদি বিএসসি (অনার্স) কোর্স বেছে নিতে হবে।

ক্যারিয়ার

বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতে উচ্চতর ডিগ্রি দেয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কৃষি, মত্স্যবিজ্ঞান, ভেটেরিনারি, পশুপালন, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি, কৃষি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান এবং এগ্রি বিজনেস অনুষদে বিভিন্ন বিভাগে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো থেকে কৃষি গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি অর্জিত কৃষি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ফার্ম, মত্স্য খামার, নার্সারি, কৃষি ওয়ার্কশপ ও হ্যাচারির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। সময়ের প্রয়োজনেই কৃষিতে উচ্চশিক্ষার পর এখন এদেশে কৃষিবিদদের বিশাল কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ইউএসএইড, ডিএফআইডি, ড্যানিডা, সিডা, উইনরক, ইরি, আইএফডিসি ও অক্সফাম জিবির মতো প্রতিষ্ঠানেও কৃষিবিদদের অগ্রাধিকার রয়েছে। এছাড়া এনজিও এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষিক্ষেত্রে কাজের পরিধি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোতে রয়েছে কৃষিবিদদের যথেষ্ট চাহিদা। এছাড়া রয়েছে বেসরকারি পেস্টিসাইড ও ইনসেক্টিসাইড কোম্পানিগুলোতে কৃষিবিদদের কাজের ক্ষেত্র। ব্র্যাক, স্কয়ার, অ্যাগ্রোবেট, লালতীর, ন্যাশনাল অ্যাগ্রোকেয়ার, প্রশিকা, আশা, এসিআই, কৃষিবিদ গ্রুপ, অ্যাকশন এইডের মতো বাংলাদেশি এসব প্রতিষ্ঠানেও উচ্চ বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে শুধু কৃষিবিদদের জন্য।

পড়ার সুযোগ

বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি দেয়া হচ্ছে সেগুলো হলো— ১. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ২. শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ৪. পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ৫. হাজী মো. দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ৬. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ৭. খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ৮. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ৯. চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ১০. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১১. শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ফিশারিজ কলেজ, জামালপুর, ১২. বরিশাল ভেটেরিনারি কলেজ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করা যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও এ ডিগ্রি নেয়া যায়।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

দেশ ছাড়াও কৃষিবিদদের বিদেশে রয়েছে উচ্চশিক্ষার বিশাল সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারতে প্রতিবছর উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক শিক্ষার্থী গমন করে থাকেন।

১. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়  উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। স্থলজ ও জলজ উত্পাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত কৃষিবিজ্ঞানের সকল শাখাই এর কার্যক্রমভুক্ত। প্রতিষ্ঠা হয়: ১৮ আগস্ট, ১৯৬১। ময়মনসিংহ শহরের দক্ষিণে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে ১২০০ একর এলাকা আচ্ছাদিত প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম পাশে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অনুষদ সংখ্যা: ৬, বিভাগের সংখ্যা: ৪৩,  শিক্ষক সংখ্যা: ৫৬২, কর্মকর্তার সংখ্যা: ৩৮০, আবাসিক হোটেল: ১২ (পুরুষ- ৯, মহিলা- ৩)। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং উপাচার্য নির্বাহী প্রধান। শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয়: ২৩১৭৯৫ টাকা, নিজস্ব জমির পরিমাণ- ১২০০ একর।

ভর্তি পরীক্ষা: ৪ নভেম্বর, প্রথম বর্ষে আসন: ১২০০

২. শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে বেঙ্গল কৃষি ইন্সটিটিউট নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলের প্রথম কৃষি শিক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯৪৭ সালে এটি পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ইনস্টিটিউট নামে ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট এ পরিবর্তন করা হয়। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম বাকৃবিতে স্থানান্তরিত হয়। ২০০১ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে ইনস্টিটিউট থেকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি।

ভর্তি পরীক্ষা: ১ ডিসেম্বর, প্রথম বর্ষে আসন: ৫০০

৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গাজীপুর জেলার সালনায় অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষার প্রসার এবং কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত আনুষঙ্গিক বিষয়ে উন্নত শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তরের লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৮ সাল থেকেই। ১৯৯৪ সালে রাষ্ট্রপতির এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে চলেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রোন মাইক্রোসকোপ গবেষণা অতি আধুনিকমানের। নিজস্ব জমির পরিমাণ- ১৮৭ একর, মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা- ১১৩৭, শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয়: ২২৩৫৭১ টাকা।

ভর্তি পরীক্ষা: ৮ নভেম্বর, প্রথম বর্ষে আসন: ৩১০

৪. সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট জেলায়  অবস্থিত বাংলাদেশের চতুর্থ                   কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত ‘সিলেট           কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৬’-এর প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ৩ অক্টোবর সিলেট সরকারি ভেটেরিনারী কলেজ পুনর্গঠন করে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষার প্রসার এবং কৃষির সঙ্গে    সম্পৃক্ত আনুষঙ্গিক বিষয়ে উন্নত শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তরের লক্ষ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর থেকেই। নিজস্ব জমির পরিমাণ- ৫০ একর, মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা- ২০২২, শিক্ষার্থী প্রতি মাথাপিছু ব্যয়: ৯৩৪৭২ টাকা।

ভর্তি পরীক্ষা: ১৭ নভেম্বর, প্রথম বর্ষে আসন: ৪২০

 

সুত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

Comments

comments