কুচিয়া চাষে সফলতাঃ বাকৃবিতে গবেষণায় সাফল্য

Kuchia

বাকৃবি সংবাদদাতাঃ

বদ্ধ পরিবেশে কুচিয়ার প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। গবেষণায় দেখা যায়, কোন ছোট পুকুর বা গর্তে কুচিয়ার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ তৈরী করে দিলেই কুচিয়া প্রাকৃতিকভাবে প্রজনন ও পোনা উৎপাদন করে থাকে যা অনুসরণ করে অল্প জায়গায় সহজেই কুচিয়ার পোনা উৎপাদন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাদু পানির কর্দমাক্ত জলাশয়ে “কুচিয়া” নামক মাছ পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এতে রয়েছে-উচ্চ মানের আমিষ, ক্যালসিয়াম, অসম্পৃক্ত চর্বি, ভিটামিন এ এবং ই, ইপিএ এবং ডিএইচএ। এটি দূর্বলতা, রক্তস্বল্পতা, হাঁপানী, অর্শ্ব, পাইলস ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। এই মাছের আকৃতি অনেকটা সাপের মতো হওয়ার কারণে অধিকাংশ বাঙালী এটি খেতে অনীহা প্রকাশ করলেও কিছু অমুসলিম সম্প্রদায় ও উপজাতীয়দের কাছে এটি প্রিয় খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। বহির্বিশ্বে কুচিয়ার ব্যপক চাহিদা থাকায় পর্যাপ্ত রপ্তাণী কারণে এই মাছ বাণিজ্যিকভাবে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এ মাছের চাষ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও চাষযোগ্য পোনা প্রাপ্তিই প্রধান অন্তরায় বলে মনে করেন গবেষকদল।

গবেষণায় দেখা যায়, কুচিয়ার প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য ৮-১০ বর্গমিটার আকারের ১ মিটার গভীরতা বিশিষ্ট ছোট পুকুর বা গর্ত খাড়াখাড়িভাবে খনন করে নাইলন জাল দ্বারা ঘেরাও করে নিতে হয়। এরপর পুকুরের কাদা অথবা এঁটেল মাটি দিয়ে ১:১ অনুপাতে ঢাল তৈরী করে নিয়ে সূর্যালোকে ১৫-২০ দিন শুকাতে হয় যাতে করে একটি মজবুত ঢাল তৈরী হয়। কুচিয়ার প্রজনন মৌসুম সাধারণত এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় তাই ফেব্র“য়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে এভাবে প্রস্তুতকৃত একটি ছোট পুকুর/গর্ত ২৫০ গ্রাম চুন দিয়ে শুদ্ধিকরণ করে পানি দ্বারা ৪০-৫০ সে.মি. পূর্ণ করতে হয়। প্রজনন পুকুর/গর্তের তলায় ১৫ সে.মি. কাদামাটির স্তর রাখা দরকার এবং তলায় ৩/৪টি ০.৫-১ মিটার লম্বা প¬াস্টিক/পিভিসি পাইপ রেখে দিয়ে কুচিয়ার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সবশেষে পুকুর/গর্তটিতে জলজ আগাছা যেমন হেলেঞ্চা, কচুরীপানা ইত্যাদি দ্বারা আবরণ তৈরী করতে হয়।

কুচিয়ার প্রজননে তৈরি গর্ত/পুকুরের পানির গভীরতা ৩০-৪০ সে.মি এর মধ্যে রাখলে এবং উপরিস্তরে জলজ আগাছা বেশি ঘন হয়ে গেলে মাঝে মাঝে কিছু অংশ সরিয়ে ফেললে পোনার উৎপাদন ভালো হয়। খাবার প্রদান ও জলজ আগাছা পাতলাকরণ এমনভাবে করতে হয় যাতে মাছ বিরক্ত বা ভয় না পায়।

ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে (পুকুরে চুন প্রয়োগের ১ সপ্তাহ পর) প্রজননক্ষম ২০০-৩০০ গ্রাম ওজনের ৮-১০ টি কুচিয়া পুরুষ এবং মহিলা ১:১ অনুপাতে প্রজননে তৈরি গর্ত/পুকুরের পানিতে পালন করতে হবে। কুচিয়া জীবন্ত খাদ্য পছন্দ করে বিধায় ছোট মাছ, কেঁচো, শামুকের মাংস ইত্যাদি প্রতিদিন বিকেলে মজুদকতৃ কুচিয়ার দেহ ওজনের ৩-৪% হারে প্রয়োগ করতে হয়।

Kuchia egg

কুচিয়া মাছের পোনা সাধারনত মে-জুন মাসে উৎপাদিত হয়ে থাকে। তাই জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে প্রজনন পুকুর/গর্ত হতে পোনা আহরণ করতে হয়। কুচিয়া পুকুরের ঢালে গর্ত করে সেখানে ডিম পাড়ে, সেই ডিম থেকে ২০-২২ দিন পর পোনা উৎপাদিত হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কুচিয়া প্রজননের জন্য বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গের মতো করে নালা তৈরী করে যার সংযোগস্থল বেশ প্রশস্ত এবং কুচিয়া ঐ প্রশস্ত অংশে ডিম পাড়ে। এজন্য প্রথমে পুকুর হতে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে পানি সেচে ফেলতে হবে। পোনা উৎপাদনের পর হতে ১০-১৫ দিন পর্যন্ত পোনা গর্তেই অবস্থান করে থাকে। এসময়ের মধ্যে আহরণ করলে বেশি পোনা পাওয়া যায়। পোনা সংগ্রহের পর পূর্ব থেকে প্রস্তুত নার্সারীতে প্রতিপালন করা যায়।

এ পদ্ধতিতে একটি ৮-১০ বর্গমিটার আকারের ছোট পুকুর/গর্ত থেকে গড়ে ৭০০-৮০০টি পোনা সংগ্রহ করা যায়।

Kuchia 2

গবেষক দলে ছিলেন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের মাকছুদ আলম খান (পিএইচডি ফেলো), প্রফেসর ড. হারুনুর রশিদ, প্রফেসর ড. মোছা: কানিজ ফাতেমা, প্রফেসর ড. এস এম রহমতুল্লাহ ও প্রফেসর ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন।

Comments

comments