স্ত্রীর হাত-পা বেঁধে চোখ তুলে নিল স্বামী

sanjida-lg20141224162714

নিউজ ডেস্ক:

১০ বছরের সংসার। অকর্মন্য স্বামীর কারণে টানাপোড়েন লেগেই ছিল সানজিদার সংসারে। দুই বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে নিরবে চোখের জল ফেলেছেন। সহ্য করেছেন স্বামীর শত অত্যাচার। এরপরেও সংসারের হাল ছাড়েননি তিনি। কিন্তু পাষণ্ড স্বামী বিদ্যুত মিনার কারণে সানজিদার চোখে আজ জলের বদলে ঝড়ছে রক্ত।

পাষণ্ড স্বামী বিদ্যুত মিনার ৮০ হাজার টাকার চাহিদা পূরণ না করায় গত ২২ ডিসেম্বর এক চোখ হারাতে হয় রাজধানীর দক্ষিণখানের মোছা.সানজিদা আক্তার রেহানাকে।

চোখ হারানোর যন্ত্রনায় শেরে-বাংলানগরের জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ৫৩৯ নাম্বার কক্ষের ১৪ নাম্বার বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন সানজিদা।

সানজিদা কাতরকণ্ঠে বিছানায় শুয়ে থেকে জাগোনিউজকে বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে দেখতে চাই। যে স্বামী না বুঝে স্ত্রীর চোখ কেড়ে নেয় তাকে দেখার খুব ইচ্ছে আমার।’

তিনি বলেন, ‘সংসার তো আর সম্ভব না! এমন পাষণ্ড স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমি।’ এ সময় মেয়ে জুথি আর ছেলে অনিককে ফেরত চান তিনি। ঘটনার পর শ্বশুর-শ্বাশুড়ি তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছেন বলে দাবি করেন সানজিদার দুলাভাই লিখন মোল্লা।

এ ঘটনায় সানজিদার বড় ভাই শহিদুল ইসলামের অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুত মিনাকে ঘটনার দিন রাতেই গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন সংশ্লিষ্ট থানায় নারী নির্যাতন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন ভাই শহিদুল।

সানজিদার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুরের শিবচর থানার বদরসুন মাতবরখানি গ্রামের মৃত ইস্কান শেখের মেয়ে সানজিদা। গত ১০ বছর আগে একই গ্রামের সিরাজ মিনার ছেলে বিদ্যুত মিনার সাথে বিয়ে হয় সানজিদার। স্বামী, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আর দুই বাচ্চা নিয়ে উত্তরার দক্ষিণখানের দক্ষিণপাড়ার ১১১ নাম্বার বাসায় বসবাস করছিলেন সানজিদা।

বিয়ের পর কয়েকবছর ভালোই কাটে তাদের সংবার। কিন্তু দুই সন্তানের জন্মের পর থেকে শুরু হয় টানাপোড়েন। এ কারণে উত্তরায় একটি গার্মেন্টেসে চাকরি শুরু করেন সানজিদা। কয়েকদিন থেকে স্বামী বিদ্যুত মিনা সানজিদার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাবি করে আসছিলেন। এ নিয়ে মারধরের শিকারও হন সানজিদা।

গত ২২ ডিসেম্বরের ঘটনা। অটোরিক্সা কেনা বাবদ ফোন করে স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করেন বিদ্যুত মিনা। কিন্তু কাছে টাকা নেই বলে জানায় স্ত্রী সানজিদা। এ কথায় উত্তেজিত হয়ে বাসায় ফেরেন মিনার। বাসায় এসে স্ত্রী সানজিদার হাত পা বেঁধে মারধর করেন। এরপর  বৈদ্যুতিক ট্যাস্টার দিয়ে সানজিদার দুচোখে উপর্যুপরি আঘাত করেন। এতে সানজিদার ডান চোখ বেড়িয়ে যায় এবং আরেক চোখ মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

পরে সানজিদার আত্মচিৎকার শুনে বাড়িওয়ালা আব্দুল হালিম এসে সানজিদাকে উদ্ধার করে উত্তরার ১১ সেক্টরের ১৭ নাম্বার রোডের রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে শেরেবাংলানগরে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ভর্তি করা হয় সানজিদাকে।

বুধবার দুপুরে হাসপাতালের ৫৩৯ নাম্বার কক্ষে গিয়ে দেখা যায় সানজিদা ১৪ নাম্বার বেডে শুয়ে এক চোখ হারানোর যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন। সানজিদার বড় ভাই শহিদুল ইসলাম রাজধানীর পান্থপথের তানভির ফার্নিচারের শো রুমে চাকরি করেন। তার সাথে হাসপাতালে কথা হলে তিনি জাগোনিউজকে বলেন, সানজিদার স্বামী বিদ্যুত মিনা কোনো কাজ করে না। টাকার অভাবে সংসার চালাতে গিয়ে সানজিদা উত্তরার নিপা নামের একটি গার্মেন্টেসে চাকরি নেন। জুয়া আর মদের নেশা নিবারণে সানজিদার কাছ থেকে জোর করে টাকা নিতো। তিনি বলেন, এর আগে গাঁজাসহ র্যাবের হাতে ধরা পড়েছিল বিদ্যুত মিনা। সেবারই সম্পর্কচ্ছেদের কথা উঠেছিল। কিন্তু বোন সানজিদা কান্নাকাটি করে ১ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন বিদ্যুতকে।

এরপরেও শোধরায়নি বিদ্যুত। এবার ৮০ হাজার টাকা দাবি করে বসে। সানজিদা বা আমাদের কারও এক সাথে এতো টাকা দেয়ার স্বামর্থ্য নেই বলে জানান। সানজিদার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা: জালাল আহমেদ জাগোনিউজকে বলেন, সানজিদার এক চোখ সম্ভবত বাঁচানো সম্ভব নয়। বাকি চোখটিও আঘাতপ্রাপ্ত। বাম চোখটি যাতে ড্যামেজ না হয়ে যায় আমরা চেষ্টা করছি।

উত্তরার দক্ষিণখান থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামীম অর রশিদ তালুকদার জাগোনিউজকে বলেন, বিদ্যুতকে গ্রেফতার করে প্রাথমিকভাবে জি্জ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। স্ত্রী সানজিদাকে মারধরের কথা অপকটে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে তিনি পুলিশে অভিযোগ করেছেন স্ত্রী সানজিদার অপর এক পুরুষের সাথে পরকিয়া সম্পর্ক চলছিল। তা জানতে পেরে তিনি স্ত্রীকে মারধর করেছেন। বড় ভাইয়ের দায়ের করা নারী নির্যাতন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বিদ্যুতকে গ্রেফতার করে বুধবার আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

Comments

comments