নিরাপত্তাহীনতায় বাকৃবি ক্যাম্পাস, দেখার কেউ নেই!

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

কৃষি শিক্ষায় দক্ষিণ এশিয়া বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ এবং বাংলাদেশের শ্রেষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ক্যাম্পাসে বসবাসরত শিক্ষক, শিক্ষার্থী সহ সকলেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চুরি, ছিনতাই, যানবাহনের আধিক্য, বহিরাগতের নিয়ন্ত্রনহীন পদচারণা ক্যাম্পাসকে আতংকিত করে রেখেছে। ক্যাম্পাসে মাদকব্যবসা, বহিরাগত সন্ত্রাসীদের আক্রমন ও মেয়েদের সামজিক অনিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন ঘটনা এর আগে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দিনদিন বেড়ে চলেছে এসব ঘটনা। ক্যাম্পাসে সড়ক দূর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর অঙ্গহানী, কয়েকজন শিক্ষকের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সহ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে গলায় ছুড়ি বসিয়ে মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। বাড়ছে অসামাজিক কার্যক্রম। কোথাও কোন নিরাপত্তা নেই। থেমে আছে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডও।

এছাড়া আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক ততপরতা, আবাসিক হল ও হোটেলোগুলোতে নিম্নমানের খাবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং রয়েছে ক্যাম্পাস জুড়ে মশা ও সাপের আধিক্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিম্নমানের বা নামমাত্র সেবা পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত জব্বারের মোড় সংলগ্ন রাস্তাঘাট অনেকটাই ভাঙ্গা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখার অবস্থা আরও নাজুক। পানি সরবরাহের টেংকিগুলোতে দীর্ঘদিনের জমানো ময়লা, টেংকি উপছিয়ে অনবরত পানির অপচয় মনে হবে যেন বিল্ডিং এর উপর থেকে ঝরণার পানি পড়ছে । নিত্যদিনের ব্যবহৃত পানিতে ময়লা, শেওলা ও বালি। অভিযোগ সাপেক্ষে মিস্ত্রি খালি হাতে এসে তালিকা ধরিয়ে দিয়ে বলেন, স্যার এগুলো কিনে নিয়ে আসেন অথচ এসব শাখায় মোটা অংকের বাজেট বরাদ্দ থাকে প্রতিবছর। এছাড়া আবাসিক এলাকায় যে বাজারটি রয়েছে তার অবস্থাও নাজুক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এগুলোর দেখার কেউ নেই।

দিনের পর দিন এসব ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের তেমন কোন ততপরতা দেখা যাচ্ছে না। তথ্যমতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য রয়েছে প্রায় ১৯০ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং সার্বক্ষনিক পুলিশ টহলের ব্যবস্থা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিশৃঙ্খলার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার জন্য রয়েছে প্রোক্টরিয়াল বডি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে চলাচলের জন্য রয়েছে দুটি মূল রাস্তা। দুটি রাস্তাই ময়মনসিংহ শহরে যাতায়াতের সাধারণ রাস্তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর-দক্ষিণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে। এই রাস্তা দুটি দিয়ে নিয়ন্ত্রনহীনভাবে চলাচল করে গণপরিবহন। এর মধ্যে আবাসিক এলাকা ও শিক্ষার্থীদের হলের সামন দিয়ে যে রাস্তাটি (১ নং রাস্তা) রয়েছে সেই রাস্তাটিতে গণপরিবহনের সংখ্যা বেশি। এই রাস্তাটিকে ঘিরে রয়েছে ছাত্রীদের চারটি আবাসিক হল, উপাচার্যের বাসভবন, মার্কেট, অডিটরিয়াম, বোটানিকাল গার্ডেন সহ ছাত্রছাত্রীদের বিচরনের মূল জায়গাগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকাবাসী ও প্রায় ৩০০০ ছাত্রীকে দৈনন্দিন কাজে ঝুকি নিয়ে ব্যস্ত এই রাস্তাটিকে পারাপারে ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছাত্রীদেরকে ঝুকি নিয়ে ক্লাসে এবং ক্যাম্পাসের বাজারে যাওয়া-আসা করতে হচ্ছে। এছাড়া এই রাস্তাটিকে ব্যবহার করে বহিরাগতরা সহজেই ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা ও সংবেদনশীল জাগয়াগুলোতে অবাধে প্রবেশ করতে পারায় ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী এলাকা থেকে কিছু বহিরাগত যুবক প্রায়ই ১ নং রাস্তা দিয়ে হেলিয়ে-দুলিয়ে বেপরোয়া ভাবে মটরসাইকেল চালানোয় অনেক দূর্ঘটনা ঘটছে বলে প্রতক্ষ্যদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের অভিযোগ। এসব বেপরোয়া মটরবাইক আরোহীরা বেশীরভাগই সরকারদলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদে প্রশাসন এবং নিরাপত্তাকর্মীরা অনেকটাই উদাসীন। এছাড়া ১ নং রাস্তাটিতে অটোরিকশা ও চার্জার রিকশা বেশী চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দূর্ঘটনা ঘটছে। উল্লেখ্য যে, একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর রাস্তাটি (২ নং রাস্তা; ফার্স্ট গেট থেকে জব্বারের মোড় হয়ে শেষ মোড়ে সংযোগকৃত রাস্তা) গণপরিবহন চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল।

জানা যায় উল্লেখিত ১ নং রাস্তাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের এবং ২ নং রাস্তাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজম্ব অর্থায়নে করা হলেও মূল ব্যবস্থাপনায় রয়েছে পৌরসভা। তবে ২ নং রাস্তাটি ১ নং রাস্তাটির ন্যায় উত্তর-দক্ষিণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করায় একসময় গণপরিবহনের মূল রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হত। ২ নং রাস্তাটি কিছুটা জড়াজীর্ন হওযায় এবং ১ নং রাস্তাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল জায়গাগুলো স্পর্শ করায় অটোরিকশা, চার্জার রিকশা, নছিমন, করিমন সহ বিভিন্ন পাবলিক পরিবহনের ভাড়া পেতে সুবিধা হয় বিধায় এসব যানবাহন ১ নং রাস্তায় বেশী চলাচল করতে দেখা যায়। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী ১ নং রাস্তাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা তাদের নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ন জায়গা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা শিক্ষার সুষ্ঠুু পরিবেশের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারী স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এরকম অনেক সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের পারাপারে রাস্তা আছে যেখানে গণ পরিবহনের চলাচল সম্পূর্নরূপে নিয়ন্ত্রিত এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাই বহমান হোক না কেন তা যদি শিক্ষার্থী বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য ঝুকিপূর্ন হয় তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রন করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যান্তরে চুরি, ছিনতাই বা সড়ক দূর্ঘটনা সব সার্বিক অনিরাপত্তার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনভাবেই এড়াতে পারেনা।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্বশাসিত সবোর্চ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে এবং সমাজের আলোকিত মানুষেরা বিচরণ করে। মুক্ত চিন্তার এই প্রাঙ্গনে সার্বিক নিরাপত্তার খাতিরে অতিদ্রুত বাস্তব ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জরুরি। অন্যথায় দেশের এই শ্রেষ্ট বিদ্যাপীঠের বিদ্যমান সমস্যাগুলো শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশে মারাত্বক প্রভাব ফেলবে।

লেখক:
শিক্ষক ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

Comments

comments