পটলা হারিয়ে দিশেহারা আছিয়া

শাহ্ আলম শাহী,স্টাফ রিপোর্টার:

বাড়িতে গিয়ে ঘরের কোনে এদিক-সেদিন হাতিয়ে আর হন্য হয়ে খুঁজেও লাভ হলোনা বৃদ্ধা আছিয়া। কোন হদিস পেলেনা তার পটলার। প্রায় ৬৯ বছর বয়সের আছিয়া বন্যায় তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে আজ শনিবার সকালে বাড়ি ফিরেছেন আছিয়া। ফিরেই হদিস করছিলেন তার পটলার। কিন্তু বিধিবাম সেই পটলাও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কালনাগিনী বন্যায় !
দিনাজপুর শহরের পশ্চিম উপকন্ঠ বালুয়াডাঙ্গা নতুন পাড়ায় বাড়ি আছিয়ার। বাজারে সব্জি বিক্রি করে জমিয়েছিলেন কিছু টাকা। সেই টাকা জমা করে রেখেছিলেন প্রথমে কাপড় তারপর পলিথিন দিয়ে মোড়ানো এক পটলায়।সেই পটলা রেখেছিলেন,তার ঘরের কোনে চৌকির নিচে এক পাতিলে। এখন তা লাপাত্তা ! তার দু’ মেয়ে বয়েছে। তাদের বিয়েও হয়েছে। স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়ে আর তার দু’সন্তানকে নিয়েই আছিয়ার বসবাস। পটলা হারিয়ে বৃদ্ধা আছিয়ার এখন শুধু আর্তি“ আমার কি হইবো বাবা,আমি ক্যামনে ব্যবসা করুম,কি খামু ! সব নিয়া গেলো কালনাগিনী বানে ভাসাইয়া!”
শুধু আসিয়া নয়, বন্যার পানি নেমে গেলেও দিনাজপুরে বন্যায় বানভাসি প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ চরম দূর্ভোগে অঅছেন। এখনো ৫০ হাজার দূর্গত মানুষ এখন ৩’শ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তাদের এখন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। প্রকোপ আকার ধারণ করেছে, পেটের পীড়াসহ নানা রোগ-বালাই। এ কারণে জেলায় এখনও সরকারি ভাবে এক’শ ২৫টি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি’র ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরো এক’শ ২০টি ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প চলছে।
দিনাজপুরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ছয় লাখ ২২ হাজার ৮’শ ৮৪ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ঘরবাড়ির নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৫৯ হাজার ২’শ ৯৯টি। বন্যার কারণে দিনাজপুরে গত ৬ দিনে মারা গেছেন ৩১ জন। এ তথ্য দিয়েছেন,জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মখলেছুর রহমান।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, জেলায় এক লাখ ২৬ হাজার হেক্টর ফসসি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে কয়েক’শ একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
বন্যার জেলার বিভিন্ন স্থানে রাস্তা,সড়ক,মহাসড়ক বিধবস্ত হওয়ায় এখন দিনাজপুর- গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়ক সহ বেশকিছু সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে দিনাজপুরের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ।
রেলওয়ের দিনাজপুরের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী আবু জাফর মো. রাকিব হাসান জানান,বন্যায় পানির স্্েরাতে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও রেলপথের দু’টি স্থানে এবং দিনাজপুর-পাবর্তীপুর রেলপথের দু’টি স্থানে রেল স্লিপারের নিচের পাথর ও মাটি সড়ে গেছে, বেঁকে গেছে রেল লাইন।রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু করা হলেও কবে নাগাদ রেল চলাচল স্বাভাবিক হবে এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।
এদিকে করতোয়া নদী’র বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ১ নং বুলাকিপুর এবং ৩ নং সিংড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা নতুন করে বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে।

বন্যা দুর্গতদের জনপ্রতি সরকারিভাবে মাত্র ১ কেজি করে চাল ও ৩ টাকা ৪৯ পয়সা করে বিতরণের কথা বলা হলেও বুধবার পর্যন্ত বন্যার এক সপ্তাহ পরও জেলার অধিকাংশ বন্যা দুর্গত মানুষের কাছে তা পৌঁছেনি। ত্রাণ না পেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন যাপন করছেন বানভাসি গৃহহীন মানুষ।
তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। শনিবার দুপুরে বিরল উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নের রাজারামপুরে গিয়ে বন্যার্ত মানুষের আহাজারি দেখা যায়। মালঝার গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক বৃদ্ধা ধলিবালা রায় জানান, বন্যার এক সপ্তাহে সরকারি এক ছটাক সাহায্যও পাননি তিনি।
পেশায় বাইসাইকেল মেকানিক এ বৃদ্ধের এখন কোনো আয় নেই। ঘরে কোনো খাবারও নেই। ইউনিয়ন পরিষদের অস্থায়ী ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে অনুনয়-বিনয় করেন একটা রিলিফের স্পিপের জন্য- ‘বাবা সকাল থাকি না খাইয়া আছ বাহে, মোর এ্যাহনা ইলিপের বেবস্থা করি দ্যাননা ক্যাঁনে।’
দিনাজপুরের বন্যা কবলিত বেশিরভাগ এলাকার চিত্র এমনই।
পাশাপাশি গৃহপালিত পশু গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। নিজেদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করতেই ত্রাহি অবস্থা, সেখানে এগুলো নিয়ে কি করবেন। অনেকে তাই ‘পানির দরে’ বিক্রি করে দিচ্ছেন গবাদি পশু। এর মধ্যে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব। কোন কোন স্থানে নেই ওষুধের ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের দেখা মিললেও বেশিরভাগ দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছেনি বলেই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।এছাড়া রাতে বানভাসি মানুষের মাঝে দেখা দেয় সাপের ভয়।
পানি সরে গেলেও বসতবাড়ি ভেঙ্গে যাওয়ায় অনেকেই বাঁশের মাচা পেতে পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। এদের অধিকাংশই রয়েছে খোলা আকাশের নিচে। কোন ভালো গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করালেই ত্রাণের আশায় ছুটে যাচ্ছে গাড়ির কাছে।

Comments

comments