উত্তরবঙ্গে জনপ্রিয় হচ্ছে বিদেশী সবজির চাষ

বগুড়া প্রতিনিধি:
উত্তরবঙ্গে এখন দেশী সবজির সঙ্গে বিদেশী সবজিরও চাষ হচ্ছে। সবজি চাষে অবারিত ফসলের মাঠ জীবনমান ও খাদ্যাভাসের সঙ্গে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। লোকজন এখন বিদেশী সবজি খাওয়াও শিখেছে। দেশে বছর কয়েক আগে মাশরুম সবজির খাতায় নাম লেখায়। আগে অনেকে মাশরুম খেত না। মনে করত এটা ব্যাঙের ছাতা। এটা যে ব্যাঙের ছাতা নয় লোকজন তা জানতে পারায় দিনে দিনে এর চাহিদা বেড়েছে। এই সবজির উৎপত্তি বিদেশে।

বর্তমানে মাশরুমের সঙ্গে বিদেশী সবজির চাষ শুরু হয়েছে। এ্যাসপারাগাস, ক্যাপসিক্যাম, লেটুস পাতা, চায়নিজ পাতা, বিট রুট, ব্রুকলি, রেড ক্যাবেজ, চায়নিজ ক্যাবেজ, স্কোয়াশ, ফ্রেঞ্চ বিম, সুইট কর্ন, বেবি কর্ন, লেমন গ্রাস, শিমলা মরিচ, স্লারি পাতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

বগুড়ার শিবগঞ্জ, গাবতলী, শাজাহানপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বিদেশী সবজির চাষ দিনে দিনে বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী জেলা জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা অঞ্চলে বিদেশী সবজি চাষ শুরু হয়েছে। বর্তমানে কোন জমি আর এক ফসলি নেই। ফসলের বহুমুখীকরণ আওতায় দেশী-বিদেশী সবজিও যোগ হয়েছে। এসব সবজি ঢাকার হোটেল সোনারগাঁ, শেরাটন, রেডিসন, ওয়েস্টিনের মতো তারকা খঁচিত হোটেলগুলোতে যাচ্ছে।

শিবগঞ্জের টেপাগাড়ি গ্রামের সবজি চাষী মিজানুর রহমান প্রায় ১৬ বছর আগে ঢাকায় খামারবাড়িতে সবজি প্রদর্শনীতে গিয়ে ক্যাবেজ, লেটুস পাতাসহ কয়েক জাতের সবজি চারা নিয়ে বগুড়া অঞ্চলে আবাদ শুরু করেন। তারপর গত কয়েক বছরে দেখাদেখি এভাবে বিদেশী সবজি আবাদ বাড়তে থাকে। দেশী সবজির আবাদ সম্প্রসারিত হতে থাকে।

দেশের অনেক হাটবাজারে এখন বিদেশী সবজি মিলছে। বিশেষ করে ক্যাপসিক্যামের চাহিদা বেশি। সালাদের সঙ্গে ক্যাপসিক্যাম যেন না হলেই নয়। খেতে সুস্বাদের এবং সকল ধরনের ভিটামিন এই সবজিতে আছে। বিশ্বে একমাত্র ক্যাপসিক্যাম সবজিরই জেন্ডার নির্ণয় করা গেছে। পুরুষ ক্যাপসিক্যামের ভেতরে ৩টি শিরা ও বীজের সংখ্যা কম। নারী ক্যাপসিক্যামে শিরা ৪টি ও বীজের সংখ্যা বেশি। দেশে সবুজ কপি বেশি ফলে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লাল কপি। এই কপির জাত এসেছে বিদেশ থেকে। লেটুস পাতার স্বাদ নোনতা ও মিষ্টি দুইই মেলে। প্রচুর ভিটামিন সি মেলে এই পাতায়। কাগজি লেবুতে যে পরিমাণ সাইট্রিক গুণাগুণ আছে তার চেয়ে বেশি গুণাগুণ আছে লেটুস পাতায়। এই পাতা শরীরের জন্য ভাল এনজাইম। স্কোয়াশ দেখতে অনেকটা শসার মতো। তবে লম্বায় একটু বড়।

খাদ্য গুণাগুণে দেশী সবজির সঙ্গে বিদেশী সবজি যোগ হয়ে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আসছে। দেশী সবজি খাবারে যাদের অনীহা তারা এখন বিদেশী সবজি খাওয়ার পর দেশী সবজির স্বাদ নিয়ে দেশী বিদেশী দুই সবজির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এদিকে একই জমিতে ধান পাট গমের সঙ্গে আইলের ওপর সবজি চাষ হচ্ছে। পুকুর ও জলাশয়ের চার ধারে, বাড়ির উঠানে চাষ হচ্ছে সবজির।

নিকট অতীতের মৌসুমভিত্তিক সবজি উৎপাদন পেরিয়ে প্রায় সব সবজি ফলছে সকল মৌসুমে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিথি বিদেশী সবজি। উত্তরবঙ্গের প্রধান আবাদ ধান। উদ্বৃত্ত ধান বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। সম্পূরক আবাদগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান নিয়েছে সকল ধরনের সবজি। একটা সময় যে কচু ঘেচু দারিদ্র্য পীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতীকী খাবার ছিল তা এখন বাণিজ্যিক আবাদে পরিণত হয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

মিষ্টি কুমড়ো, কপি, শসা, চিচিঙ্গা, করলা, লাউ, কুমড়ো, ঢেঁড়স, পটোল, আলু সব ধরনের শাক কাঁচাকলার হাট এখন মহাসড়কের ধারে বসে। সবজি আবাদ প্রধান অঞ্চল বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে মহাসড়কের ধার দিয়ে চ-িহারা হয়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বসে সবজির হাট। প্রতিদিন পূর্বাঞ্চল থেকে ট্রাকের পর ট্রাক আসছে উত্তরাঞ্চলে। ফিরছে সবজি নিয়ে। কিছু অংশ উড়োজাহাজের কার্গো ফ্লইটে যাচ্ছে বিদেশ বিভূঁইয়ের বাজরে। এত সবজি উৎপাদিত হওয়ায় মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে শক্ত খাবার মাছ গোশ্ত কমতে শুরু করেছে। হালে মুরগি, খাসি, গরুর গোশ্তের দাম বেড়েছে। সবজি দিয়ে নিত্য নতুন রেসিপি তৈরি হচ্ছে। এই রেসিপি পৌঁছে যাচ্ছে গৃহিণীদের কাছে। তৈরি হচ্ছে সবজির বৈচিত্র্যের সুস্বাদের খাবার।
ক’জন প্রবীণ মন্তব্য করলেন এই অবস্থা চলতে থাকলে মানুষের রোগ ব্যাধি অনেকটা কমে গিয়ে গড় আয়ু বাড়বে।

উল্লেখ্য, অধিক শাক সবজি ও এক কেজি ওজনের নিচে মাছ ‘এ্যান্টি এজিং’ (শারীরিক গঠনে বয়স কম মনে হয়ে আয়ু বেড়ে যাওয়া) খাবার হিসাবে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জরিপ অনুযায়ী গত দশ বছরে উত্তরাঞ্চলে সবজি আবাদ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বর্তমানে অনেক সবজির হাইব্রিড জাত নেমেছে। মুলা, গাঁজর, টমেটো শিম, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়ো, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা ইত্যাদি বলতে গেলে সারা বছরই ফলে। সিজনের আলুর আবাদও আর সিজনের মধ্যে থাকছে না।

Comments

comments