ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির রোল মডেল নরসিংদীর সিরাজ মিয়া

নরসিংদী প্রতিনিধি:
রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের যত্রতত্র ব্যবহারে মাটির গুণাগুণ প্রায় ধ্বংসের মুখে। শস্যের বাড়তি ফলন নেই, নেই কৃষকের মুখে হাসি। এই যখন দেশের অবস্থা তখন চাষাবাদে জৈব সার, কম্পোস্ট সারের বিকল্প নেই। ভার্মি কম্পোস্ট মাটির নিরাপদ স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ জরুরি। কেননা মাটিতে পানির ধারণা ক্ষমতা ও বায়ু চলাচলের জন্য মাটিতে ৫ ভাগ জৈব সার থাকার প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র ১.৮ ভাগ। তাই মাটিতে জৈব সারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তেমনি একটি চিন্তুা থেকে নরসিংদীতে সম্প্রতি কেঁচো কম্পোস্ট তৈরিতে সাড়া জাগিয়েছেন কৃষক মো. সিরাজ মিয়া।

বাংলাদেশ কৃষি বিভাগের কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ (সিআইজি) নামে একটি সমিতি বাড়ির পাশেই প্রতিষ্ঠিত হলে তাতে ভর্তি হন কৃষক সিরাজ মিয়া। সেই সমিতির মাধ্যমে কৃষি বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ লাভ করতে থাকেন। এভাবে বেশ কিছুদিন যাওয়ার পর টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখতে পান ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কলা কৌশল ও গুণাগুণ। সে সংবাদ দেখার পর থেকে কেঁচো থেকে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির স্বপ্ন বুনতে থাকে সিরাজ মিয়া। এই স্বপ্ন পুরণের আশায় তিনি যোগাযোগ করেন নরসিংদী সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল হাই এর সাথে।

কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল হাই কৃষক সিরাজ মিয়ার আগ্রহ দেখে উৎসাহ প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, তার অফিসের উপ সহকারী মোশারফ হোসেন ও মাহমুদা বেগমের মাধ্যমে কেঁচো দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়া, কেঁচো দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু নগদ অর্থ সহায়তা ও কেঁচো সংগ্রহ করে দেন। সেই থেকে কৃষক সিরাজ মিয়া তার নিজ বাড়িতে কেঁচো দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কাজে মনোনিবেশ করেন। মাত্র ১ বছর পূর্বে ২টি ঝুড়িতে ২ কেজি কেঁচো দিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে নিজ জমিতে ব্যবহার করে ভাল ফলনই পান তিনি। এরপর আশ পাশে কৃষকরা তার কাছে থেকে ভার্মি কম্পোস্ট ক্রয় করে।

নরসিংদী সদর উপজেলার শীলমান্দি ইউনিয়নের উত্তর শীলমান্দি এলাকায় সিরাজ মিয়া বিবার্তাকে জানান, আমি ১ বছর পূর্বে কৃষি অফিসের সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির কাজ শুরু করি। ৬ মাস আমার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পেয়েছি। ফসল দেখে আশপাশের কৃষকরা আমার কাছ থেকে ভার্মি কম্পোষ্ট নেয়ার জন্য বাড়িতে বসে থাকেন। কিন্তু আমি চাহিদা মেটাতে পারিনা। ফলে আরো বৃহৎ আকারে তৈরি করেছি। যা থেকে প্রতি দেড়মাসে কমপক্ষে ৪শত কেজি ভার্মি কম্পোস্ট ও ৪ কেজি কেঁচো বিক্রি করা সম্ভব হবে। এছাড়া এই প্রকল্প দেখে আশপাশে ছোটো আকারে আরো প্রায় ৫/৬ জন কৃষক ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করছেন। এতে করে এলাকায় ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের দিকে ঝুকছেন কৃষকরা।

তিনি আরো জানান, কম্পোস্ট তৈরি করতে কলাগাছ, কচুরীপানা, মুরগির বিষ্টা ও বীজ হিসেবে কেঁচো ব্যবহার করে এই সার তৈরি করে থাকি। এই কম্পোস্ট ব্যবহার করলে জমিতে অন্যান্য সার ও কীটনাশক কম ব্যবহার বা না করলেও চলে।

ভার্মি কম্পোস্ট সরকারি বা বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাজারজাতের করলে সিরাজ মিয়ার মতো অনেক কৃষক এতে আগ্রহ প্রকাশ করতো বলে দাবি করেন কৃষি উপ সহকারী মোশারফ হোসেন ও মাহমুদা বেগম।

নরসিংদী সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল হাই জানান, শীলমান্দির সিরাজ মিয়া বর্তমান সময়ে নরসিংদীর জন্য সত্যিই একজন রোল মডেল। কেননা এর আগে জেলার বিভিন্ন স্থানে অনেই ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করেছিলো কিন্তু স্থায়ীত্ব পায়নি। কারণ হিসেবে দেখা গেছে তারা কেউ নিজের জমিতে ব্যবহার করেনি। তারা শুধু বাজারজাতের চিন্তায় ছিলো। কিন্তু সিরাজ মিয়া প্রায় ১০ বিঘা জমি নিয়ে বিভিন্ন ফসলাদি চাষ করেন। তাতে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করেছেন ভালো ফলনও পেয়েছেন। তাকে দেখে আশপাশের কৃষকরাও ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। চেষ্টা করছি ভার্মি কম্পোস্ট বাজারজাত করার জন্য। যদি এটি করতে পারি তাহলে শুধু নরসিংদী সদরেই কমপক্ষে ২’শ জন কৃষক নিজেরা ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে তাদের জমিতে ব্যবহার এবং বাজারজাত করবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মো. লতাফত হোসেন জানান, সিরাজ মিয়ার ভার্মি কম্পোস্ট দেখে আনন্দিত হয়েছি। এজন্য বেশি আনন্দিত হয়েছি যে, তিনি প্রথমে তার জমিতে ব্যবহার করে ফলন ভালো পেয়েছেন তাই তিনি তা সম্প্রসারণ করেছেন। তার অনুপ্রেরণায় ও সহায়তায় জেলায় ৭৮ জন কৃষক এখন ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে নিজেদের জমিতে ব্যবহার করছেন। চেষ্টা করছি তাদের এই ভার্মি কম্পোস্ট কিভাবে সহজেই বাজারজাত করা যায়। গত সপ্তাহে অন্য জেলা থেকে প্রায় ৩ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট এনে কৃষকদের মধ্যে ব্যবহারের জন্য বিতরণ করেছি। এই পরিমাণ ভার্মি কম্পোস্ট যদি কৃষকরা তৈরি করতে পারতো তাহলে হয়তো আমদানি করতে হতোনা।

তিনি আরো বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে একটি আদর্শ ভার্মি কম্পোস্ট ১.৫৭% নাইট্রোজেন, ১.২৬% ফসফরাস, ২.৬০% পটাশ, ০.৭৪% সালফার, ০.৬৬% ম্যাগনেশিয়াম, ০.০৬% বোরণ রয়েছে। এছাড়া কেচোঁ কম্পোস্টে অন্যান্য কম্পোস্টের চেয়ে প্রায় ৭-১০ ভাগ পুষ্টিমান বেশি থাকে। কেঁচো কম্পোস্টের উপাদানে উপস্থিতি শতকরা হিসেবে নাইট্রোজেন ১.০, ফসফেট ১.০, পটাশিয়াম ১.০, জৈব কার্বন ১৮.০ ও পানি ১৫-২৫ ভাগ। তাই ফসল ভালো হয় এবং ইচ্ছে করলে তা বিষ মুক্ত হিসেবেও করা যেতে পারে।

Comments

comments