যবের রোগ ও তার প্রতিকার

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামানঃ

বাংলাদেশে খাদ্য ফসল হিসাবে যব সামান্য পরিমানে চাষ হয়ে থাকে। খাদ্যমানের দিক থেকে যব চালের চেয়ে পুষ্টিকর। চালের তুলনায় যবে প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের পরিমান বেশী। অপরদিকে যব চাষে পানির প্রয়োজন ধানের তুলনায় খুবই কম। যে জমিতে সেচের সুবিধা নেই অথচ মাটিতে যথেষ্ট পরিমানে রস থাকে সে জমিতে বিনাসেচেও সফলভাবে যব চাষ করা যায়। কিন্তু যবের গোড়া পঁচা রোগ ও পাতা ঝলসানো রোগ যব চাষের একটি অন্যতম প্রতিবন্ধক। এব ফলে যবের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন হয়। এ দু’টি রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলে যবের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পাবে। যবের রোগ দু’টি সম্পর্কে বর্নণা করা হল।

১। রোগের নাম : গোড়া পঁচা রোগ (Foot and root rot)

রোগের কারণ : স্কেলেরোসিয়াম রফসি (Sclerotium rolfsii) ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার:

মাটিতে ও বীজে বসবাসকারী ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগের উৎপত্তি হয়। স্যাঁতস্যাঁতে মাটি ও ঠান্ডা আবহাওয়া এ রোগ বিস্তারে সহায়ক।

রোগের লক্ষণ :

»  এ রোগের ফলে বীজে পচন ধরে, চারা ঝলসে যায় এবং গোড়া ও শিকড় পঁচে যায়।
» চারা গজানোর পর গাছ আক্রান্ত হলে প্রথমে গাছটি হলুদ বর্ন ধারন করে এবং আস্তে আস্তে গাছটি মারা যায়।
» এ অবস্থায় টান দিলে গাছটি সহজেই মাটি হতে উঠে আসে।
» আক্রান্ত গাছটির গোড়া ভালভাবে পরীক্ষা করলে গোড়ায় সাদা বর্ণের ছত্রাকের মাইসিলিয়াম এবং অনেক সময় সরিষার দানার মত স্কেলেরোসিয়া দেখা যায়।
» এ সময় সমস্ত শিকড় পচে যায়, শিকড় ও কান্ড সংলগ্ন অংশে কালচে বাদামী দাগ দেখতে পাওয়া যায়।

রোগের  প্রতিকারঃ

» উপযুক্ত আর্দ্রতায় যবের বীজ বপন করতে হবে।
» সুস্থ, সবল ও উচ্চ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা সম্পন্ন বীজ বপন করতে হবে।
» কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
» উচ্চ তাপমাত্রা ও বৃষ্টিহীন মৌসুমে (মার্চ-এপ্রিল) জমি ভালভাবে চাষ দিয়ে ফেলে রাখতে হবে।
» জমিতে রোগ দেখা দিলে কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় মাটিতে স্প্রে করতে হবে।

২। রোগের নাম : পাতা ঝলসানো রোগ (Leaf blight)

রোগের কারণ : বাইপোলারিস সরোকিনিয়ানা (Bipolaris sorokiniana) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার :

রোগটি প্রধানত বীজ বাহিত, তবে মাটি, ফসলের পরিত্যক্ত অংশে ছত্রাকটি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে। বীজ বা মাটিবাহিত জীবানুর মাধ্যমে প্রাথমিক আক্রমনের পর রোগটি বাতাসের সাহায্যে বয়স্ক পাতা থেকে নতুন পাতা এবং এক গাছ থেকে অন্য সব গাছই রোগক্রান্ত হয়। পাতা ঝলসানো রোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বাতাসের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং নাবীতে বীজ বপন।

রোগের লক্ষণ :

» সবুজ পাতায় ঈষৎ ছোট ছোট বাদামী রঙের ডিম্বাকৃতি দাগ পড়ে।
» দাগুলার চারপাশ দিয়ে একটি হলুদ আবরণ দেখা যায়।
» পরবর্তীতে দাগগুলো ক্রমশ: বড় হতে থাকে এবং দাগের মধ্যস্থল ধূসর বর্ণ ধারণ করে।
» গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে দাগগুলো একত্রিত হতে থাকে এবং রোগটি নীচের পাতা থেকে উপরের পাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
» এ কারণে পাতা আগাম শুকিয়ে যায় যা দূর থেকে আগুনে পোড়া বা ঝলসানো বলে মনে হয়।
» রোগের অনুকুল আবহাওয়ায় যবের শীষও আক্রান্ত হয় এবং বীজে রোগের সংক্রমন ঘটে।

রোগের  প্রতিকার :

» রোগমুক্ত জমি হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
» গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
» পরিমিত মাত্রায় সার ও সেচ প্রয়োগ করতে হবে।
» কার্বেন্ডাজিম (অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
» রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রোপিকোনাজোল (টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে অথবা টেবুকোনাজল (ফলিকুর ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব)
মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
শিবগঞ্জ, বগুড়া।
ইমেইলঃ zaman.path@gmail.com

Comments

comments