মাছের বর্জ্য থেকে মাছের খাবার তৈরীতে সফল বাকৃবির তন্ময়

মো. আব্দুর রহমান:
বাংলাদেশ বর্তমানে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে পৃথিবীতে চতুর্থ। বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৮.৭৮ লাখ মেট্রিকটন মাছ উৎপাদিত হয়। মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি কিন্তু খাওয়ার অযোগ্য মাছের বর্জ্যও প্রচুর পরিমানে উৎপন্ন হয়। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে মাছের এসব বর্জ্যগুলো ফেলে দেওয়া হয় রাস্তার ধারে, ডাস্টবিনে, পুকুরের পানিতে, নদীর পানিতে অথবা সমুদ্রের পানিতে যা পানি ও পরিবেশ দূষণ করে থাকে। তাছাড়াও বাংলাদেশের মাছের খাবার তৈরীর জন্য প্রায় ৪০-৪৫% কাঁচামাল বিদেশ থেকে রপ্তানি করা হয় যা আমাদের জিডিপির উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক প্রকার অন্তরায়। কিন্তু সুষ্ঠুভাবে মৎস্যজাত বর্জ্য ব্যবহার করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এসকল সমস্যা সমাধানের প্রকল্প উপস্থাপন করে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের গ্রাজ্যুয়েট তন্ময় কুমার ঘোষ ২০১৬ সালে অর্জন করেন ‘বিওয়াইএলসি ইয়ুথ লিডারশিপ প্রাইজ ২০১৬’

তারপর ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) এর অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) এর সহায়তয়ায় তিনি তার প্রকল্প ‘একুয়ালাইন’ সঞ্চালনা শুরু করেন ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে। তার প্রকল্প একুয়ালাইনের মুল উদ্দেশ্য ছিল মৎস্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করা।

সম্প্রতি তিনি মাছের বর্জ্য বা উচ্ছিষ্ট অংশসমূহ ব্যবহার করে আদর্শ মানের মাছের খাবার তৈরী করতে পেরেছেন। এতে তিনি ৫০% মাছের বর্জ্য ও ৫০% অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান ব্যবহার করেছেন। তার তৈরীকৃত মাছের খাবারে প্রোটিন ৪৩.২৩%, লিপিড ৫.৮৩%, ফাইবার ৪.৮৩%, অ্যাশ ১৬.৯৩% বিদ্যমান। প্রায় ১৫ বার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে তিনি এটি তৈরী করতে পেরেছেন।

তিনি জানান, তার তৈরীকৃত এই মাছের খাবারটি পাউডারের ন্যায় এবং তিলাপিয়া মাছের নার্সারি ফিড হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। একুয়ারিয়ামে তেলাপিয়া মাছের ওপর ট্রায়াল দেওয়ার পরে তিনি আশানুরূপ ফলাফল পেয়েছেন। বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) থেকে করা তার প্রোডাক্টের অ্যামাইনো এসিড প্রোফাইলও বেশ ভাল এসেছে। এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদে পুষ্টি বিভাগের ল্যাবরেটরীতে ইন ভিট্রো এবং ইন ভিভো এনালাইসিস করে ক্যাটল ফিড হিসেবে তার প্রোডাক্টের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছেন এবং আশানুরূপ ফলাফল পেয়েছেন।

ইয়ুথ লিডারশিপ প্রাইজ জয়ী তন্ময় কুমার ঘোষের ‘একুয়ালাইন’

তার এই কাজ সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের সহকারী প্রফেসর মোহাম্মদ শফিকুর রহমান শিশির বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল এবং যুগোপযোগী উদ্ভাবন। তন্ময়ের তৈরীকৃত মাছের খাবারটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময়’।

তন্ময়কে তার এই প্রোডাক্টটি বাজারজাত শুরু করার কথা বললে তিনি জানান, তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছের খাবার উৎপাদন করা সম্ভব। তবে তার একার পক্ষে বর্তমান অবস্থান থেকে এটার বাণিজ্যিকীকরণ করা প্রায় অসম্ভব।

এক্ষেত্রে তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ফিশ ফিড কোম্পানিগুলো চাইলে খুব সহজেই এটাকে বাণিজ্যিকীকরণে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও চাইলে তার এই প্রকল্পকে খুব সহজেই বাণিজ্যিক আকার দিতে পারে।

পাশাপাশি তিনি জানান, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানিগুলো অনায়াসেই তার এই উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাছের খাবার উৎপাদনে করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারে। প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি তিনি বাজার বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসার মডেল দাড় করেছেন।

কৃষি অর্থনীতির ছাত্র হয়ে কিভাবে এই উদ্ভাবন করলেন- এ প্রশ্নের জবাবে তন্ময় বলেন, প্রচন্ড ইচ্চাশক্তি আর কাজ নেওয়ার পরে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ববোধ থেকেই এটা করা সম্ভব হয়েছে। সকলের সহযোগিতা নিয়ে আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায়।

পাশাপাশি তিনি জানান, পশু পালন অনুষদের এনিমেল নিউট্রিশনে অধ্যয়নরত মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রাহাত আহমেদ তাকে সবসময় দিক-নির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তার প্রকল্প টিমে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞানে অনুষদে অধ্যয়নরত তুলি, সানোয়ার, সৌরভ, আসিফ, প্রিয়াংকা এবং পশুপালন অনুষদের শিক্ষার্থী বাপ্পি সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

Comments

comments