কী ছিল নিখোঁজ মারুফ জামানের কম্পিউটারে

নিউজ ডেস্কঃ

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান (৬৫)। ৪ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যার দিকে তিনি বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর বাসায় ফেরেননি। ওইদিন রাত সাড়ে আটটার দিকে তিন অজ্ঞাত ব্যক্তি তার বাসায় প্রবেশ করেন। অবশ্য এর আগে মারুফ জামান বাসায় ফোনে করে ওই তিন ব্যক্তিকে তার ব্যবহৃত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

কিন্তু ওই তিন ব্যক্তি কে এবং কেনইবা তারা মারুফ জামানের কম্পিউটার ও ল্যাপটপ বাসা থেকে নিয়ে গেলেন, এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

এদিকে ওই তিন ব্যক্তি মারুফ জামানের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও দুটি ক্যামেরা নিয়ে যান বলে জানিয়েছে পরিবার। এছাড়াও ওই তিন ব্যক্তি বাসায় প্রবেশ করে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ নেওয়ার পাশাপাশি তার ঘরে তল্লাশি চালিয়েছে, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ সব বিষয় বিবেচনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মনে করছেন, মারুফ জামানকে পরিকল্পিতভাবেই অপহরণ করা হয়েছে। তবে তিনি আসলেই অপহৃত হয়েছেন নাকি নিখোঁজ তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশের ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফী বলেন, মারুফ জামান নিখোঁজের ঘটনায় দায়ের করা জিডির তদন্ত চলছে। তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও নেয়া হয়েছে। মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ওই আবাসিক ভবনের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মারুফ জামানের বাসা থেকে যে ল্যাপটপ, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক ও ক্যামেরা অজ্ঞাত তিন ব্যক্তি প্রবেশ করে নিয়ে গেছে- সে বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ধানমন্ডি থানা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, জব্দকৃত সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে- তিন জন ব্যক্তি বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তবে তাদের চেহারা স্পষ্ট নয়। এ কারণে তাদের এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

থানার একজন কর্মকর্তা বলেন, মারুফ জামানকে অপহরণ করা হয়েছে নাকি নিখোঁজ হয়েছেন; বিষয়টি তার পরিবারের কাছে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। মারুফ জামানের ব্যবহৃত ওইসব ইলেকট্রনিক পণ্যে কী ধরনের তথ্য, ছবি ও ভিডিও ফুটেজ রয়েছে তাও তারা জানেন।

এদিকে বুধবার বিকেলে মারুফের পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের কাছে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, তিনি ৪ ডিসেম্বর সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেলজিয়াম থেকে দেশে আসা তার ছোট মেয়ে সামিহা জামানকে বাসায় নিয়ে আসতে বিমানবন্দরে যান। ধানমন্ডির বাসা থেকে তিনি গাড়ি চালিয়ে বের হন। তার কিছুক্ষণ পর ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বাসার ল্যান্ডফোনে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গৃহপরিচারিকাকে বলেন, তার বাসায় কম্পিউটার নিতে কেউ একজন আসবেন। এর কিছুক্ষণ পর রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে তিন জন সুঠামদেহী ভদ্রলোক বাসায় এসে তার ল্যাপটপ, বাসার কম্পিউটারের সিপিইউ, ক্যামেরা, একটি স্মার্টফোন নিয়ে যায় ও তার ঘরে তল্লাশি চালায়। সেসময় মারুফ জামানের ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫ ডিসেম্বর দুপুরে ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয় (জিডি নং ২১৩)। সন্ধ্যায় তার গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-গ-২১-১৩৯৯) পুলিশ খিলক্ষেত থেকে উদ্ধার করে। তবে মারুফ জামানের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন।

জিডির তদন্তের সূত্র ধরে পুলিশ জানায়, মারুফ জামানের সর্বশেষ অবস্থান ছিল সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১৯ মিনিটে কাওলা, দক্ষিণখান এলাকায়। এরপর থেকেই তার আর কোনো অবস্থান মেলেনি। মঙ্গলবার সকালে কুড়িল ৩শ’ ফিট সড়কে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার গাড়িটি খিলক্ষেত থানা পুলিশ উদ্ধার করে। বুধবার সকালে ওই গাড়িটি ধানমন্ডি থানা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

মারুফ জামান কাতার ও ভিয়েতনামের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কোরের (ষষ্ঠ শর্ট কোর্স) একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন হিসাবে ১৯৮২ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে আত্মীকরণ হন। ২০১৩ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যান।

গত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে রহস্যজনক ‘নিখোঁজ’ ১৩ জনের মধ্যে ৮ জন ফিরেছেন। বাকি ৫ জনের এখনও সন্ধান মিলেনি। নিখোঁজরা হলেন- নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. মুবাশ্বার হাসান সিজার, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ সাদাত আহমেদ, কল্যাণ পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আমিনুর রহমান, কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইশরাক ও সাংবাদিক উৎপল দাস।

Comments

comments