বিটকয়েন অবৈধ, লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন বাংলাদেশে অবৈধ। এই বিটকয়েন পৃথিবীর অন্য কোনও দেশেরও স্বীকৃত বা বৈধ মুদ্রা নয়। এ ধরনের মুদ্রায় লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ। এই মুদ্রার লেনদেনে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এ জন্য বিটকয়েন ব্যবহার করে লেনদেন না করতে সবাইকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের এ সংক্রান্ত একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দেশে বিটকয়েনের লেনদেন হচ্ছে, যা কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত নয়। ফলে মানুষের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ ধরনের অবৈধ মুদ্রার লেনদেন না করতে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে আরও বলা হয়েছে, অনলাইনভিত্তিক ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপ্পেল ও লিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিনিময় প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হচ্ছে। এসব ভার্চুয়াল মুদ্রা কোনও দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা বৈধ মুদ্রা নয়। ফলে এর বিপরীতে কোনও আর্থিক দাবির স্বীকৃতিও নেই। ভার্চুয়াল এসব মুদ্রার লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত না হওয়ায় তা আইন দ্বারা সমর্থিত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নামবিহীন বা ছদ্মনামে প্রতিসঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এছাড়া, অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনকারী গ্রাহকরা ভার্চুয়াল মুদ্রার সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকি এড়াতে বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন বা এসব লেনদেনের প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে, ‘বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ: বিটকয়েন বাই অ্যান্ড সেল বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হয়েছে। লোকাল বিটকয়েনস ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিং ও সাধারণ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিটকয়েন কেনাবেচা করা যাচ্ছে।

মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও বিটকয়েন দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ফলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিটকয়েনের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭’ সম্মেলনের এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আগামী বছরের জুনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটির কাজ হবে বাংলাদেশে কিভাবে দ্রুত ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন করা যায়, তা খতিয়ে দেখা।’

জানা গেছে, অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’র প্রচলন করে। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সেই ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেওয়া হয় বিটকয়েন।

ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনলাইনে দু’জন ব্যবহারকারীর মধ্যে এটি সরাসরি (পিয়ার-টু-পিয়ার) আদান-প্রদান হয়। লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয় ‘ক্রিপ্টোগ্রাফি’ নামের পদ্ধতি। নিজের পরিচয় প্রকাশ না এই পদ্ধতিতে লেনদেন করা যায়। অন্যদিকে, লেনদেনের ব্যয়ও খুব কম। তবে বিটকয়েনের জনপ্রিয়তার বড় একটি কারণ হলো— বিটকয়েনে বিনিয়োগ করলে কয়েক গুণ লাভ হবে, এমন ধারণা।

সম্প্রতি বিটকয়ন মুদ্রাটি আলোচনায় উঠেও এসেছে এ কারণেই। গত এক বছরে এই ভার্চুয়াল মুদ্রাটির দাম হু হু করে বেড়েছে। ফলে অনেকেই এই বিটকয়ন কেনার দিকে ঝুঁকছেন।

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিটকয়েন মূলত ইন্টারনেট সিস্টেমে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কে প্রোগামিং করা আছে, যা চাইলে কেনা যায়। তবে এটি কোনও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনও দেশের জারি করা মুদ্রা নয়। ইন্টারনেট সিস্টেমকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এই সিস্টেমকে ডেভেলপ করেছে। এটাকে এক ধরনের জুয়া খেলা বলা যেতে পারে।’

মনসুর বলেন, ‘এই মুদ্রার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এর কোনও কর্তৃপক্ষ নেই। এ কারণে এটা অবৈধ। তবে জুয়ারিদের কাছে এটা জনপ্রিয়। একসময় এর দাম ছিল একশ ডলার। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে হয় এক হাজার ডলার। এখন এর দাম ১৯ হাজার ডলারে উঠে গেছে। যে কারণে লোভে পড়ে অনেকেই এই মুদ্রায় বিনিয়োগ করছে। কিন্তু হঠাৎ করে এর পেছনের লোকেরা বাজার থেকে সরে গেলে বিপদে পড়বেন অনেকেই।’

Comments

comments