বিলুপ্তির পথে প্রসিদ্ধ কাসা ও পিতল শিল্প!

নিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে কাঁসা-পিতলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। একসময় আমাদের দেশে পিতলের জিনিসপত্র ব্যবহারের খুব প্রচলন ছিল।

এক সময় টাঙ্গাইলের সমৃদ্ধশালী ব্যবসা ছিল কাসা ও পিতল শিল্প। শুধু টাঙ্গাইল নয় বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এই শিল্পের সুনাম ছিল। টাঙ্গাইলকে প্রসিদ্ধ করেছে কাসা ও পিতল শিল্প। টাঙ্গাইলের কাঁসা ও পিতলের তৈরি তৈজস পত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিলো সারা দেশে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র বিদেশেও রপ্তানী হতো।

বিশেষ করে এগুলো ছিলো ভারত বিখ্যাত। অবিভক্ত বাংলায় একদিন প্রসিদ্ধ ছিল টাঙ্গাইলের তামা, কাঁসা ও পিতল শিল্প। এটি বিগলন ঢালাই প্রযুক্তির অন্তর্গত। আর সুদৃশ্য কারুকার্য ও অনুপম গুণগত মানের জন্যই টাঙ্গাইলের কাঁসা ও পিতলের তৈরি তৈজসপত্র এতটা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

টাঙ্গাইলে কাঁসা ও পিতলের অপূর্ব শিল্প কর্মের জন্য ব্রিটিশ সরকার কাঁসা শিল্পীদের মধ্যে নাম করা অনেকেই প্রশংসা ও পদকে ভূষিত করেছেন। এদের মধ্যে প্রয়াত মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার, হারান কর্মকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

টাঙ্গাইলের প্রধান কাগমারীর কাঁসা, পিতল ও তামার ধাতুশিল্প আজো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এখনো টাঙ্গাইলের কাগমারীসহ জেলার নানা গ্রামাঞ্চলে এই কাঁসা ও পিতল শিল্পীরা তৈরি করছে নানা দ্রব্যাদি। ব্যাপক প্রসিদ্ধ ও চাহিদার ভিত্তিতে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্থানে কাঁসা ও পিতলের শিল্প গড়ে উঠলেও কাগমারী, মগড়া ও সাকরাইল গ্রাম ছিল বেশি প্রসিদ্ধ।

এক সময় এ সকল গ্রামে শতশত পরিবার কাঁসা ও পিতল শিল্পী ছিল। দিন রাতে তাদের কাঁসা পেটানোর শব্দে গ্রামগুলো মুখর থাকতো। হিন্দুদের মধ্যে কর্মকার সম্প্রদায়েরাই এ শিল্পের সঙ্গে বংশানুক্রমে জড়িত। টাঙ্গাইলের কর্মকারগণ অত্যন্ত সুনিপূণ কৌশলে নিরলস শ্রম দিয়ে আজও তৈরি করছে তামা, কাঁসা ও পিতলের থালা, বাটি, কলসী, গ্লাস, জগ, ঝারি, বদনা, ঘটি, লোটা, পঞ্চ প্রদীপদান, মোমবাতিদান আগর বাতিদান, কুপি, চামচ, কাজলদানী, প্রমাণ আছে। গ্রাম সমবায়ে কাংস্যকার, কাংস্যবণিক ইত্যাদি বৃত্তিধারী শ্রেণী ছিল। পাঠান, মোগল ও বৃটিশ শাসনামলে কাংস্যকার যখন যে রূপ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। সেরূপ বিকাশ লাভ করতে পেরেছিলো।

টাঙ্গাইলের বরাইল ও কাগমারীতে পিতলের কাজের প্রধান্য রয়েছে। টাঙ্গাইলের কাগমারী ও মগরা দুটি গ্রামে উপরে উল্লেখিত জিনিস ছাড়া আরো তৈরি হয় কাঁসার ঘণ্টা, জয়ঢাক, তামার কুশা-কুশি, টাট পুষ্পাধার ইত্যাদি।

দিন বদলেছে। আধুনিক প্লাস্টিক, এলোমেনিয়ামের ও মেলামাইনের তৈজসপত্রের আমদানীতে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা ও পিতল শিল্পের উন্নয়নে প্রচুর কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা আধুনিক মেশিনারির ব্যবস্থা এবং বাজারের চাহিদানুযায়ী আধুনিক রুচিসম্মত জিনিস তৈরির ব্যবস্থা না থাকার কারণে এ শিল্পের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে টাঙ্গাইলের কাগমারী ও মগরা দু’টি গ্রামে বাস করে অনাধিক ৫০টি পরিবার। তারা কেউ কেউ বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। ফলে কমে যাচ্ছে কাঁসা ও পিতল শিল্পীর সংখ্যা।

টাঙ্গাইল জেলা সদরে এই শিল্পের দোকান থাকলেও বেচাকেনা নাই বললেই চলে। তাই এই শিল্পের মন্দাভাব দিনদিন বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এবং সরকারিভাবে উদ্যোগ না নিলে টাঙ্গাইলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যাবাহী এ লোক শিল্পটি কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল বিসিক শিল্পনগরী এক্সটেনশন কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান আল- ফারুক বলেন বিসিক থেকে অতীতেও কাসা ও তামার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেয়েছে। ভবিষ্যতে কাসা তামা শিল্প কে ধরে রাখার জন্যা আমাদের যা করনীয় সে ভাবেই আমরা করে যাবো বলে জানান তিনি।

Comments

comments