নিরাপদ পশু খাদ্যই দিতে পারে নিরাপদ মাংস, দুধ ও ডিম

ড. মোহাম্মদ আল-মামুন:

পশু সম্পদ মাংস, দুধ ও ডিমের মাধ্যমে মানুষের অন্যতম পুষ্টি উপাদান, প্রানীজ আমিষ সরবারহ করে থাকে। পৃথিবীর দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানী এবং পশু খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গবাদিপশু দ্রুত মোটাতাজাকরনের লক্ষ্যে আশির দশকে শুরু করেছিল গ্রোথ প্রোমোটার বা গ্রোথ হরমনের ব্যবহার। কিন্তু কালের ধারাবাহিকতায় এসকল গ্রোথ প্রোমোটারের ক্ষতিকারক দিক সম্বন্ধে মানুষ অবহিত হয়। গ্রোথ প্রোমোটার পশুর দেহে ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বৃদ্ধি সহ বিভিন্নভাবে পশুর মেটাবলিজমের বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে থাকে। কিন্তু এসকল সিনথেটিক এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার ব্যবহারের ফলে প্রানীদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

শুধু তাই নয়, এসকল ঔষধ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত পশু পন্য অর্থ্যাৎ মাংস, দুধ ও ডিম ভক্ষনের ফলে মানুষের মধ্যেও ক্ষতিকারক রেসিডিউয়াল ইফেক্ট লক্ষ্য করা যায়। যার ফলশ্রুতিতে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস সহ দেখা দেয় বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। যার দরুন ৯০ এর মাঝামাঝি থেকে পশু খাদ্যে এ সকল ঔষধের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানী ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বীগ্ন হয়ে পরেছেন। অধিকন্তু, ২০০৬ এর ১ জানুয়ারী থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পশু খাদ্যে গ্রোথ প্রোমোটারের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে অবৈধ ঘোষনা করেন। এর ফলে পশু উপাদান, মাংস, দুধ এবং ডিমের উৎপাদন হ্রাস পায়। কিন্তুু পৃথিবীর দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার জন্য প্রাণীজ আমিষের চাহিদা বাড়তে থাকে। এই বাড়তি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বিজ্ঞানীসহ পশু খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং কৃষককুল হন্যে হয়ে উঠে সিনথেটিক গ্রোথ প্রোমোটারের বিকল্প পশু খাদ্য উদ্ভাবনের নেশায়। ন্যাচারাল হার্বস এর ব্যবহারের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো।

ন্যাচারাল হার্বস হতে পারে স্বাস্থ্যপ্রদ, নিরাপদ মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনের বিকল্প মাধ্যম। ন্যাচারাল হার্বস ইতমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গ্রীন গ্রোথ প্রোমোটার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্লানটেইন একটি বহুবর্ষজীবি ঘাস জাতীয় হার্বাল প্ল্যান্ট যার বৈজ্ঞানিক নাম Plantago lanceolata  যে কোন ধরনের মাটিতে জন্মায় এবং খরা ও প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এটি ৮ থেকে ২৪০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভাল জন্মায়। উচ্চতা ৪০-৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয় এবং হেক্টর প্রতি উৎপাদন ক্ষমতা ৪-৭ টন। ট্র্যাডিশনাল হিউম্যান মেডিসিন হিসেবে ইউরোপ, আমেরিকা এবং চীনে এই হারবাল প্ল্যান্টের ব্যবহারের রয়েছে শত শত বছরের পুরানো ইতিহাস। মানবদেহে স্বর্দি, কাশি, ঘা, উচ্চ রক্তচাপ সহ ক্যান্সারের মত দুরারোগ্য ব্যাধিতেও রয়েছে এর কার্যকারিতা। আমি জাপান সরকারের বৃত্তির আওতায় জাপানের ইউয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল থেকে এই হার্বাল ঘাসের গুনাগুন এবং পশুর দেহে এর কার্যকারিতার উপর বিভিন্ন ধরনের গবেষনা কার্যক্রমে নিয়োজিত আছি। সাধারণ ঘাসের তুলনায় এর মধ্যে অধিক পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ এবং ‘ই’ আছে।

এ ছাড়া এর মধ্যে এমন কিছু বায়োএ্যাকটিভ কম্পোনেন্ট আছে যা সাধারণ ঘাসের নেই। এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবেও এর রয়েছে চমৎকার কার্যক্ষমতা। এসকল বৈশিষ্ট্যাবলি সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার পর আমি শুরু করি গবাদিপশুর দেহে এর উপকারিতা বিষয়ক গবেষণা। কার্বন এবং হাইড্রোজেনের স্টেবল আইসোটপ ডাইলিউশনের মাধ্যমে পশুর প্লাজমা লেভেলে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের মেটাবলীজম নিয়ে গবেষনা করা হয়। এতে আমরা অত্যন্ত ভাল ফলাফল নিশ্চিত হই। তা হলো এই ঘাস খাওয়ানোর ফলে গবাদিপশুর দেহের কোষের মধ্যে প্রোটিনের সিনথেসিসকে বাড়িয়ে দেয়, আর এই বৃদ্ধির হার অধিক তাপমাত্রা বা হিট স্ট্রেস এ আরও ভালো হয়। অর্থাৎ আমাদের মত উষ্ণ অঞ্চলে অধিক তাপমাত্রায় পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি অনেকাংশে লাঘব হয়। কিন্তু এই প্লানটেইন উষ্ণ তাপমাত্রাতেও হিট স্ট্রেসকে অনেকাংশে লাঘব করে। গবাদিপশুর শক্তির অন্যতম উৎস ভোলাটাইল ফেটিএসিড এবং গ্লুকোজের মেটাবলীজমেও রয়েছে উপকারী প্রভাব। এছাড়া গবাদিপশুর দেহ থেকে মিথেন গ্যাস নিঃসরনের পরিমানও কমিয়ে দেয়। তাই গ্রীন হাউজ ইফেক্ট বা গ্লোবাল ওয়ারমিংয়েও রয়েছে এর অত্যন্ত উপকারী প্রভাব।

মানবদেহে এই হারবাল প্ল্যান্টের রয়েছে কৃমিনাষক, বেদনানাষক, উচ্চ রক্তচাপ নাষক এবং এন্টি ক্যান্সার সহ বিভিন্ন শুভ দিক। অধিকন্তু প্রাণীদেহের সেল বা কোষ ধ্বংষ হওয়া থেকেও রক্ষা করে। তাই এই প্লানটেইন বর্তমানে ইউরোপীয় দেশগুলোতে গ্রীন টি (চা) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাপানের মত উন্নত দেশেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে গ্রীন টি এবং লজেন্স এর উপকরন হিসেবে।

এই হার্বস শুধু পশুর উৎপাদন বৃদ্ধিই নয় বরং পশু উপাদান সংরক্ষনে এবং মাংসের গুনাগুন অর্থাৎ লাল টকটকে রং, ফ্লেভার এবং চর্বির গুনগত মানবৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে। মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের সর্বত্রই মানুষ ঝুঁকে পড়ছে অর্গানিক প্রোডাক্টের দিকে। আর তাইতো ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন সহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদিত পশু উপাদানের (মাংস, দুধ ,ডিম) চেয়ে অর্গানিক অর্থাৎ হারবাল খাদ্য খাইয়ে উৎপাদিত পশু উপাদান ক্ষেত্রবিশেষে ৩ থেকে ৪ গুন বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ শিক্ষীত সচেতন মানুষ এখন খাদ্যের গুনগতমানের দিকেই বেশি খেয়ালী হয়ে পরছেন। উন্নত বিশ্বের চিত্র যখন এই তখন আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলো হিমসিম খাচ্ছে প্রয়োজনীয় মাংস, দুধ ও ডিমের যোগান দিতে।

আমাদের কাছে কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটি অর্থাৎ গুনাগুনের চেয়ে পরিমানটাই মূখ্য বিষয়ে পরিণত হয়ে পরেছে। গ্রোথ প্রোমোটারের ব্যবহারের কোন তাৎক্ষনিক বা তড়িৎ প্রতিক্রিয়া বা উপসর্গ নাই। তাই সাধারণ মানুষ এর কুফল/ ক্ষতিকর দিক সহজেই অনুধাবন করতে পারে না। কিন্তু এদের রয়েছে সাইলেনট লিথাল স্ট্রেথ বা ধীর প্রতিক্রিয়া। এজন্য আমাদেরকে এখনই সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে সাধারণ মানুষের মাঝে। আমাদের দেশে গবাদিপশুর খাদ্য বা এনিম্যাল ফিডের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আমাদের উচিত গবাদিপশুর সবুজ ঘাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বে প্রায় তিন দশক গ্রোথ প্রোমোটার ব্যবহারের পর এর ক্ষতিকর দিক অনুধাবন করে এখন বন্ধ করেছে এর ব্যবহার এবং একই সাথে বৃদ্ধি করছে পশুখাদ্যে ন্যাচারাল হার্বস এর ব্যবহার।

আর আমাদের যেহেতু এখনও সবুজ ঘাসেরই ঘাটতি পূরনে সবুজ বিপ্লব করা দরকার তাই এখনই মোক্ষম সময় সবুজ সাধারণ ঘাসের সাথে সাথে সবুজ হারবাল ঘাসের উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু করা। মনে রাখতে হবে “সেফ ফিড সেফ ফুড” অর্থাৎ “নিরাপদ পশু খাদ্যই দিতে পারে নিরাপদ মাংস, দুধ ও ডিম”। আমাদের দেশে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্নভাবে প্রচার প্রচারনা করা হচ্ছে। তবে মায়ের জন্য নিরাপদ খাদ্য (মাংস, দুধ ও ডিম) নিশ্চিত করা না হলে শুধু মায়ের স্বাস্থ্যই নয় নবজাতক শিশুর স্বাস্থ্যেও পড়তে পারে মারাত্মক প্রভাব।

বর্তমানে  BAS-USDA PALS এর অর্থায়নে প্লান্টেইল হার্ব কৃষক পর্যায়ে ব্রয়ালার মুরগীর মাংস উৎপাদনে এবং গাভীর দুধের ফ্যাট এসিড এর গুণগত মান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। এ জন্য মানিকগঞ্জ সদরে গীলন্ট গ্রামে এক একর জমি লিজ নিয়ে প্লান্টেইল হার্ব চাষ করা হয়েছে এবং ঐ গ্রামের পাশের কয়েটি গ্রাম থেকে ৬টি ব্রয়ালার ফার্ম নির্বাচন করা হয়েছে।

 

____________________________________
ড. মোহাম্মদ আল-মামুন
প্রফেসর, পশু পুষ্টি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ই-মেইল: mamamun@bau.edu.bd

 

Comments

comments