ময়মনসিংহে সৌদির খেজুর চাষ করে কোটিপতি মোতালেব

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
খেজুর বা খুরমা মানেই সৌদি আরব বা মরু অঞ্চলের ফল। মরুভূমিতেই এর চাষ হয়। বাংলাদেশে এ ফলের চাষ অনেকের কাছে অবাস্তব। কিন্তু এই অবাস্তবকেই বাস্তবে পরিণত করেছে ময়মনসিংহের মোতালেব মিয়া।

নিজ উদ্যোগে নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশে ফলিয়েছেন উত্তপ্ত আবহাওয়ার দেশ সৌদি আরবের খেজুর। আর এর মাধ্যমে বেকারত্বেরর গ্লানি মুছে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। এখন তার নেই অর্থের টানাপোড়েন। খেজুর চাষে ঘুরেছে ভাগ্যের চাকা, বেড়েছে সামাজিক মর্যাদা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের ভালুকা সিডস্টোর বাজার থেকে সখিপুর সড়কে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে তার সৌদি খেজুর বাগান। সেখানে চাষ হচ্ছে আজুয়া, শুক্কারী ও বকরী জাতের খেজুর। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে থাকা গাছেও ধরছে ফলন। বাগানে শত শত গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো রয়েছে। গাছে সেচ দেওয়ার জন্য রয়েছে কয়েক হাজার বড় ফুট প্লাস্টিকের পাইপ। তার বাগানে ঢুকলেই মনে হবে ব্যক্তি উদ্যোগে খেজুর চাষে সত্যিই এক অসম্ভব কর্মযজ্ঞের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

আর তাই এক সময়ের সৌদি প্রবাসী দেশে ফিরে এখন রীতিমতো কোটিপতি। মাটির ছোট একটি ঘর থেকে তিনি বাস করছেন ইটের দ্বিতল দালানে। সৌদি খেজুরের বাগান করে যে সফলতা পেয়েছেন সারা জীবন সৌদি আরব থাকলেও সফলতা আসত কী না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তার।

জানা যায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মোতালেব আর্থিক টানাপড়েনে মধ্যেই ১৯৯৭ সালে পাড়ি জমান সৌদি আরব। সেখানে তিনি মাসিক ৫০০ রিয়াল বেতনে খেজুরবাগানে চাকরি নেন। তিনি আবুধাবি ও দোবাইসহ বিভিন্ন এলাকার খেজুর বাগান পরিদর্শন করে অতি অল্প সময়ে খেজুর চাষের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার ইচ্ছে জাগে তিনি দেশে ফিরে খেজুর বাগান করবেন।

নিজস্ব চিন্তার আলোকে ২০০১ সালে ৩৫ কেজি কাঁচা খেজুর নিয়ে তিনি দেশে ফিরেন। খেজুরের বীজ থেকে চারা উৎপাদন করেন। তিনি বাড়িসংলগ্ন ১০ কাঠা জমিতে সেই চারা রোপণ করে পরিচর্যা শুরু করেন। বাংলাদেশে সৌদি খেজুর চাষ করা নিয়ে এলাকার মানুষ তখন বলাবলি করেন, মোতালেবের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। খেজুর বাগান করে এলাকায় এক সময়ের মাথা খারাপ মোতালেব এখন খেজুর মোতালেব হিসেবে পরিচিত।

মোতালেবের স্ত্রী মজিদা বেগম শুরুতে স্বামীর এমন কর্মকাণ্ডে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও সব সময় সহযোগিতা করতে থাকেন। আগাছা পরিষ্কার, পানি সেচ, সার গোবর দেওয়াসহ গাছের পরিচর্যা শুরু করেন।

তিন বছরের মাথায় চারাগাছে প্রথম খেজুর ফললে আসে কাঙ্ক্ষিত সফলতা। অবশেষে ২০০৬ সালে দু’টি চারাগাছে খেজুর টিকলে তার স্বপ্ন পূরণ হয়। এসব খেজুর থেকেও তিনি এলাকার লোকজনদের খাইয়ে বীজ রেখে দিয়ে চারা উৎপাদন করতে থাকেন। আস্তে আস্তে ফল ধারক গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মোতালেবের খেজুরবাগান সারা দেশে পরিচিতি লাভ করে।

মোতালেব অসাধ্য সাধন করে বুঝিয়ে দিলেন বাংলাদেশের মাটি সৌদির মতো মিষ্টি খেজুর উৎপাদনে যথেষ্ট উপযোগী। ১৪ বছরে তিনি অধিক মূল্যে অনেক গাছ খেজুরসহ বিক্রি করে কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। বর্তমানে তার রয়েছে তিনটি খেজুরের বাগান। বাড়িসংলগ্ন বাগানে এ বছর ১৫-২০টি গাছে প্রচুর খেজুর ধরেছে।

তিনি তার বাগানের খেজুর, চারা ও গাছ বিক্রি করে জীবনে আর্থিক সাফল্য পেয়েছেন। এক সময় বাবার দেওয়া একটি মাটির ঘরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। খেজুর বাগান করার পর তিনি চার দিকে বেষ্টনী প্রাচীর, দর্শনার্থীদের বিশ্রামাগারসহ নিজের একটি বহুতল ভবনের দোতলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ করে সেখানে বসবাস করছেন। বড় ছেলে মোফজ্জল (১৭) এইচএসসিতে লেখাপড়া করে, ছোট ছেলে মিজান (১১) পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। বড় মেয়ে মর্জিনার (২০) বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে স্ত্রী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার।

বাগান মালিক মোতালেব মিয়া জানান, বিভিন্ন সময়ে তার বাগান পরিদর্শনে অনেকে আসলেও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা এখনো পাননি তিনি। তার বাগানের খেজুর চারা উৎপাদনের উপযোগী হওয়ায় এক কেজি চারা উৎপাদন যোগ্য খেজুর চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। তিনি মনে করেন যাদের উঁচু পতিত চালা জমি রয়েছে; তারা সৌদি খেজুরের চাষ করে সহজেই অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারেন। আর যারা লেখাপড়া করে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন তারাও খেজুরবাগান করে বেকারত্ব ঘোঁচাতে পারেন।

মোতালেব আরও বলেন, আমি আরো জায়গা বাড়াবো। মোট তিন একর জমির ওপর আমার খেজুর বাগান হবে। আগামী ২০১৯ সালে আরো এক একর জায়গাতে আমার খেজুরের চাষ বাড়ানো হবে। তিনি জানান, সৌদি আরবে খেজুর চাষ করে কিন্তু সার প্রয়োগ করে না। আমরা সার দেওয়ার কারণে তাদের চেয়ে আমাদের খেজুর আকারে আরো বড় হয়।

Comments

comments