শাবিপ্রবিতে ‘জিনঘটিত রক্তশূন্যতা’ শনাক্তকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন

শাবিপ্রবি প্রতিনিধি:
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এর জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি (জিইবি) বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ ফারুক মিয়ার নেতৃত্বাধীন গবেষকদল নাড়ীরক্ত (Umbilical Cord Blood) কোষের ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জিনঘটিত মারাত্মক ‘বক্রকোষীয় রক্তশূন্যতা’(Sickle Cell Anaemia) রোগ দ্রুত ও সঠিকভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর বক্রকোষীয় রক্তশূন্যতা নির্ণয়ে (newborn screening) প্রথমবারের মত নাড়ীরক্ত ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক ফারুক।

মূল গবেষক দলের অন্যতম সদস্য জীবপ্রযুক্তিবিদ শেখ অনিকা রহমান ও দলের বাকী সদস্য ও সহযোগী ডাক্তারদের সহায়তায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। অনিকা বর্তমানে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের অধীনে আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার সাথে কর্মরত আছেন।

বক্রকোষীয় রক্তাল্পতা বিশ্বময় এটি একটি ভয়ঙ্কর জিনঘটিত ব্যধি, এটি মূলত পরিব্যাক্ত প্রচ্ছন্ন জিনের সমসংগঠনের ফলে সৃষ্টি হয়। এই রোগ সৃষ্টিকারী জিন আক্রান্ত বা বহনকারী পিতা-মাতার শরীর থেকে সন্তানের দেহেও সঞ্চারিত হতে পারে, জিন বিজ্ঞানের ভাষায় এমন রোগগুলোকে সামগ্রিকভাবে Autosomal Recessive Disorder বলে চিহ্নিত করা হয়।

বক্রকোষীয় রক্তাল্পতা রোগের কারণে বুকে, পিঠে, হাতে ও পায়ে ব্যাথা হতে পারে, কোষ-কলা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সদ্যজাত শিশুদের নানান অস্বাভাবিকতা, কিডনিজনিত সমস্যা, জন্ডিস, হাত-পায়ের স্ফীতি, ক্রনিক ইনফেকশান, রক্তশূন্যতা, মুত্ররোগ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি সত্তর লাখ মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় রক্তশূন্যতায় ভোগে। এর মাঝে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশী। গর্ভাবস্থায় এই রক্তশূন্যতার প্রভাব বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশী শিশু হিমোগ্লোবিন জনিত অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্ম নেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৬ লাখেরও বেশী বক্রকোষীয় রক্তাল্পতা রোগের বাহক আছেন।

বক্রকোষীয় রক্তস্বল্পতা রোগ চিকিৎসার উর্দ্ধে নয়। কিন্তু সঠিক চিকিৎসার জন্যে সঠিক ও দ্রুততম সময়ে রোগের শনাক্তকরণ অতীব জরুরী। আণবিক কৌশল অবলম্বন করে সহজেই বক্রকোষীয় রক্তাল্পতা রোগটিকে শনাক্ত করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, রোগটির জন্যে দায়ী জিনটি পিতা-মাতা থেকে সন্তানে সঞ্চারিত হলো কিনা, এমনকি পিতা বা মায়ের মাঝে জিন দাতা কে তাও শনাক্ত করা সম্ভব।

সাধারণত সন্তান ভূমিষ্ট হবার সাথে সাথেই নাড়ি কাটার মাধ্যমে মা’র কাছ থেকে তাকে আলাদা করে নেয়া হয় এবং তখনই নাড়িরক্ত বা Cord Blood বেরিয়ে যায়। শাবিপ্রবির এই গবেষণা কাজে নাড়িরক্ত বের হবার সময়ই সেটিকে সংগ্রহ করা হয় এবং সেটির আণবিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সদ্যজাত শিশুটি বক্রকোষীয় রক্তাল্পতা রোগে আক্রান্ত কিনা কিংবা এর জন্যে দায়ী জিনের বাহক কিনা তা নির্ণয় করা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থাতেই শনাক্ত করা গেলে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় এনে শিশুর এই মারাত্মক রোগের ব্যবস্থাপনার সুযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, যেকোন হাসপাতাল বা ডায়াগনিস্টিক সেন্টারে এ কৌশলে সহজেই সাধারণ PCR যন্ত্রের সাহায্যে সঠিকভাবে এই রোগ শণাক্ত করা সম্ভব।

Comments

comments