বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স কি দেখতে চাই

শাহরিয়ার মনির:
অর্ডিন্যান্স কি? খায়, নাকি মাথায় দেয়? জানতে চাই, বুঝতে চাই এবং দেখতে চাই…

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি শিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ। দেশের মধ্যে এটি কৃষি শিক্ষার মাদার ইনস্টিটিউট। আজ দেশ যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান এই বিদ্যাপীঠের তথা এর গ্র্যাজুয়েটদের। কিছুদিন আগে বিশ্বব্যাপি র‌্যাংকিং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মধ্যে এক নম্বর বা দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্টানের মর্যাদা পেয়েছে। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং আনন্দের। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং আয়তনের ক্ষেত্রেও এই ক্যাম্পাস সবার সেরা বলা যায়।

এত এত সুনামের পরেও এই ক্যাম্পাসের নিয়ম-কানুন, শিক্ষা ব্যাবস্থায় কিছু অসঙ্গতি আছে। যার কারণে এই ক্যাম্পাস বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি এই প্রতিষ্ঠানের অর্ডিন্যান্স জানার অধিকার শিক্ষার্থীদের নেই। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নিজস্ব কিছু নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, গঠনতন্ত্র থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রয়েছে সংবিধান। এসব নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, গঠনতন্ত্র, সংবিধান সবাই জানতে পারে বা জানার অধিকার আছে। তেমনি বাংলাদেশে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধানের একটি লিখিত বই আছে যা অর্ডিন্যান্স। এই অর্ডিন্যান্সে কি আছে তা প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বই ভাগ লোকেরই অজানা এবং অদেখা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় চলে এই অর্ডিন্যান্সের উপর ভিত্তি করে। এই অর্ডিন্যান্সকে অনেক স্যারেরা কাল বই বলে থাকেন কারণ এটার মোড়ক নাকি কাল রংয়ের। যা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সংবিধান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এই অর্ডিন্যান্স নামক কাল বইয়ের অনায্য আক্রমণের শিকার হতে হয় এখানকার কর্তব্যরত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারা। অনেক ক্ষেত্রেই অর্ডিন্যান্সের ব্যবহার হয় স্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যে। যা নীতি বিরোধী। এরকম কিছু ঘটনা আমি নিজে দেখেছি।

১.
আমি যখন লেভেল ২ এ পড়ি, তখন আমরা বর্ধিত সেমিষ্টার ফি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করি। আন্দোলনে নের্তৃত্ব দেওয়ার সুবাধে তখনকার কর্তব্যরত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গের সাথে একাধিকবার মিটিং করার সুযোগ হয়েছে। এতে অনেকের সাথেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক হয়েছে। সেই সময়ে একদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু বৈশাখী চত্বরের দিকে হাটছিলাম। সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সাথে দেখা হয়। উনার সাথে আমরা আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে কথা বলি। কথার ফাঁকে কোন এক প্রসঙ্গে তিনি বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অবিভাবক ভিসি স্যার চাইলে ছেলেকে মেয়ে বা মেয়েকে ছেলে বানানো ছাড়া সবই করার মত ক্ষমতা উনার আছে। আমি বললাম, তাহলে ভিসি স্যার আমাদের সেমিষ্টার ফি বাদ দিতেই তো পারে। উনি বললেন, না না এটা স্যার পারবে না, অর্ডিন্যান্সে এটা নেই। একথা শুনে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। অর্ডিন্যান্স এখানে ঢাল স্বরুপ।

২.
অনার্স শেষে মার্কশীট তোলার জন্য কন্ট্রোলার অফিসে ব্যাপক ভীড়। এতে উনাদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমে গেল। কিন্তু ফাঁকি না দিলে কি হয়। কি করা যায়। আছে তো অর্ডিন্যান্স। আবার সেই অর্ডিন্যান্সের দোহায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিল। বললাম, স্যার অডিন্যান্সে কি শুধু আমাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেওয়ারই নিয়ম আছে? আমাদের পক্ষে কিছু নাই? অর্ডিন্যান্স দেখতে চাই। কিন্তু দেখতে পারলাম না। কারণ উন্মুক্ত করলে উনারা কিছুটা বিপদেই পরবেন। ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে তো।

৩.
ক্লাসে ৬০% উপস্থিতি না থাকার কারণে পরীক্ষা দিতে দেয় না অনেক ডিপার্টমেন্ট বা স্যার। আবার উপস্থিতির উপর প্রতি বিষয়ে আছে দশ মার্কস। এই দুইটা নিয়মই আসে অর্ডিন্যান্সের দোহায়ে। এটা নিয়ে অনেক স্যারদেরও দ্বিমত আছে। বলেন, যদি মার্কসই কাটব তাহলে পরীক্ষা দিতে দিব না কেন! আর যদি পরীক্ষা দিতে নাই দেয় তাহলে মার্কস কাটব কেন! অর্ডিন্যান্স তো একটা মানার কথা বলে। কিন্তু উনারা শুনে না। বরং শিক্ষার্থীদের জীবনটাই নষ্ট করে।

উপস্থিতির উপর যে এই মার্কস এটা মনে হয় এই ক্যাম্পাসেই আছে। এটা দ্বারা শিক্ষার্থীদের ক্লাস করাতে বাধ্য করা হয়। বাধ্য করিয়ে ক্লাসে উপস্থিত রেখে কি লাভ, যদি আগ্রহী আর মনযোগী না করানো যায়?এতে তো আপনাদের অযোগ্যতাই প্রকাশ পায়। যিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আগ্রহী বা মনযোগী করাতে পারেন উনার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা উপস্থিতির মার্কের আশা না করেই উপস্থিত থাকে।

৪.
প্র্যাকটিকেল খাতা লিখো দিস্তার পর দিস্তা। সেটা আবার কপি পেস্ট করে। মানে এতে শুধু সময়ই নষ্ট হয়। এই ক্ষেত্রেও অর্ডিন্যান্সের দোহায়। এরকম আরো অনেক ক্ষেত্রেই অডিন্যান্সকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

অর্ডিন্যান্স তো শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই বিধি-বিধান লেখে নি, এতে তো শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্যও বিধি-বিধান লিখিত আছে। সেগুলো মানা তো আপনাদের জন্যেও বাধ্যতামূলক? আপনারা কি অর্ডিন্যান্স মানেন আপনার নিজের ক্ষেত্রে? তাহলে কেন অর্ডিন্যান্সের দোহায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে ফেলেন? কেন অর্ডিন্যান্স নামক পবিত্র বিধানকে আমাদের কাছে অভিশপ্ত করে তুলেন? কেন এর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেন? আমরা তো আপনাদের সম্মান করতে চাই, চাই আপনাদেরকে বিশ্বাস করতে।

অর্ডিন্যান্স এই বিশ্ববিদ্যাল পরিবারের সবার জন্য। সবাই অর্ডিন্যান্স জানবে এবং মানবে। এটা জানার অধিকার সবার আছে। এই অর্ডিন্যান্স জানার মাধ্যমে সবাই সবার দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হবে। তাই এটা উন্মুক্ত করা এখন সময়ের দাবী।

অর্ডিন্যান্সকে বই আকারে পাবলিশ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
____________________________
শিক্ষা্র্থী,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

Comments

comments