মেলায় ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করছেন তানযীর তুহিনের মা!

সাহিত্য ডেস্ক:
সন্ধ্যার পরপর সময়, তখনও জমেনি মেলা। দর্শনার্থীরা বিছিন্নভাবে ঘুরাঘুরি করছেন, কেউ কেউ বই উল্টাচ্ছেন, কেউবা পছন্দের তালিকা অনুযায়ী কিনেও ফেলছেন দুই-একটা বই। এরইমধ্যে অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে সাত-আটটি বই হাতে নিয়ে ঘুরছেন একজন প্রবীণ নারী। পরনে কমলা রঙের মধ্যে সাদা প্রিন্টের শাড়ি, কাঁধে একটা ঝোলা। ঝোলার ভেতরেই বইগুলোর ভার বহন করছেন তিনি। দর্শনার্থীদের কাউকে কাউকে ডেকে নিচ্ছেন আর বলছেন- ‘তুমি তো অনেক বই কিনো, আমার বই বের হয়েছে, একটা বই কিনো না বাবা…’ কথায় স্পষ্ট আকুতি। কিন্তু এই আকুতি কী অর্থের বিনিময়ে শুধু বই বিক্রির জন্য? না! একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল তার প্রকৃত পরিচয়। নাম- ড. আকন্দ সামসুন নাহার, অন্যভাবে পরিচয় করালে তিনি জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী তানযীর তুহিনের মা।

পাঠক হয়তো বিভ্রান্ত হবেন ভেবে তুহিনের মা কেন বই ফেরি করে বেড়াচ্ছেন? এ খবর জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হয় তুহিনের সঙ্গে, হেসে বললেন- ‘মায়ের সঙ্গেই কথা বলে দেখুন না।’ তুহিনের দেওয়া নম্বর নিয়ে ফোন করা হলো ড. সামসুন নাহারকে। কোনো পত্রিকা থেকে ফোন করা হয়েছে জেনে প্রথমে খুব অবাক হলেন। তারপর জানালেন ‘লঞ্চ টার্মিনাল’ বইটি তার প্রথম বই নয়, এর আগে তার একে একে কুড়িটি বই প্রকাশিত হয়েছে। একটু অবাক হয়েই জানতে চাওয়া, একুশটি বই এর লেখিকাকে কেন আমরা এত দিন চিনিনি? উত্তরে সরল জবাব দিলেন এই মা, ‘আমি তো আসলে এতকিছু বুঝতাম না, এখনও বুঝি না। বই নিজেই বের করেছি। কোথায় এগুলো দিলে পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পারবো, জানা নেই। আমার বইগুলো মানুষ পড়লেই তৃপ্তি পাবো’। সেটা তো মেলার স্টলগুলোতে দিলেও পাঠকের কাছে পৌঁছাবে। আবারও সরল উত্তর- ‘বই কীভাবে বিক্রি করে আমি তো আসলে জানি না। অনেকদিন ধরেই বই প্রকাশ করছি, বইগুলো বাসায় জমে আছে। আমাকে তো কেউ চিনে না, মেলায় গিয়ে মানুষকে তাই বলে বলেই বই দেখাচ্ছি, কারোর ইচ্ছা হলে কিনছেন, কেউ কেউ দেখে যাচ্ছেন। তবে যারা পড়ছেন, তারা কিন্তু দ্বিতীয়বার মেলায় এসে আমাকে খুঁজছেন, আমার অন্য বইও নিয়ে যাচ্ছেন’।

ছোট থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত সামসুন নাহার। পড়ালেখার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করার পরেও থেমে থাকেননি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনায় নিয়েছেন আরও দুটি মাস্টার্স ডিগ্রী। ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন পি.এইচ.ডিও। লেখালেখি প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি তো সেই বরিশালের ভোলার গ্রাম থেকে এসেছি। অনেক রকম বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে তো জীবনের এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। বিয়ের পরেও আমার জীবন স্মুথ করতে পারিনি। হ্যাজবেন্ড দেশের বাইরে যাওয়া-আসার মধ্যে থাকতেন। ছেলে দুটোর দেখাশোনার দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়েছে। এগুলো করে প্রথম জীবনে আমি লেখালেখি করলেও প্রকাশ করতে পারিনি’। নিজের জীবনের গল্প নিয়ে আত্মজীবনী লেখারও ইচ্ছা জানালেন ৭৫ বছর বয়সী সামসুন নাহার। এবারের মেলায় প্রকাশিত তার ‘লঞ্চ টার্মিনাল’ মূলত উপন্যাসের বই। বইটিতে লঞ্চ টার্মিনাল ঘিরে একটি পরিবারের গল্প ওঠে এসেছে নানা আঙ্গিকে।

উল্লেখ্য ড. আকন্দ সামসুন নাহারের জন্ম ১৯৪৩ সালে। ভোলার তজুমদ্দীন থানার এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে। ইডেন কলেজ থেকে অনার্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স শেষ করে, পরবর্তীতে আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং শিক্ষাব্যবস্থাপনায় দুটি মাস্টার্স করেন। ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেন পি.এইচ.ডি ডিগ্রী। দীর্ঘদিন তিনি সরকারী কলেজে অধ্যাপনা করেন। কাজ করেছেন ন্যাশনাল ক্যারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সট বুক বোর্ডেও।

Comments

comments