হাওরে নির্বিচারে চলছে অতিথি পাখি নিধন

নিউজ ডেস্ক:

দেশের সর্ববৃহৎ অতিথি পাখির সমাগমস্থল হাকালুকি হাওরে নির্বিচারে চলছে বিষটোপে ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার। এক সময় পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হতো হাকালুকি হাওরকে। তবে পাখি রক্ষায় হাওরে নেই কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প। সেই সাথে শিকারি চক্রের অপতৎপরতার কারণে দিন দিন অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে বলে পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সরেজমিনে হাকালুকি হাওর পরিদর্শনে গেলে হাওরের বিভিন্ন বিলে মৃত অতিথি পাখি পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে টোলার বিলে অসংখ্য মরা পাখির দেখা মিলে। স্থানীয়দের ধারণা, পাখিগুলো বিষটোপে মারা হয়েছে। মরা পাখিগুলোর বেশির ভাগই বেগুনি কালেম ও লেঞ্জা বলে জানান বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ বশির আহমেদ। তবে বিষটোপে না ফাঁদে আটকা পড়ে মারা গেছে তা ময়নাতদন্ত ছাড়া প্রমাণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

হাকালুকি হাওরে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে রয়েছে দুটি বিট অফিস। কিন্তু দুটি অফিসে মাত্র দুইজন কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাছাড়া পরিবেশ অধিদফতর হাওর উন্নয়নে কাজ করছে। তবে সেটা যেন শুধুমাত্র কাগজে-কলমে। কেউই পাখি নিধনের দায় নিতে চায় না। আর সেই সুযোগে শিকারিচক্র অনেকটা বেপরোয়া।

বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক জানান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএসের ক্রেল প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে হাকালুকি হাওরে দু’দিনব্যাপী জলচর পাখি শুমারি অনুষ্ঠিত হয়। এবার ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০ পাখি হাকালুকি হাওরে বিচরণ করতে দেখা গেছে।

সরকার ১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০২ সাল থেকে হাওর উন্নয়নে পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা হাওরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে।

পরিবেশ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে ২০০৪ সাল থেকে হাকালুকি হাওরের জলচর পাখি শুমারির কাজ শুরু হয়। হাকালুকি হাওরের প্রায় প্রতি বছর ৬০ থেকে ৬৫ প্রজাতির সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩০ হাজার পর্যন্ত অতিথি পাখি গণনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ গত কয়েক বছর থেকে পাখির সংখ্যা কমতে শুরু করে। পাখি শুমারিকালে হাকালুকি হাওরে বেয়ারের ভুতিহাঁস, মরচে রঙয়ের ভুতিহাঁস, পাতারি ফুটকি, দাগি রাজহাঁসের মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির অতিথি পাখির দেখা মিলতো।

চলতি জলচর পাখি শুমারিকালে এই প্রজাতির কোনো পাখির দেখা মেলেনি দেশের সর্ববৃহৎ এই পাখির সমাগমস্থলে। পাখি ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে যেমন হাকালুকি হাওরে অকাল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, নির্দিষ্ট সময়ে শীতের প্রভাব কম থাকা, সব মিলিয়ে জলবায়ুর যে পরিবর্তন তা অতিথি পাখি কম আসার পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ। তাছাড়া বিষটোপ ও ফাঁদ পেতে পাখি শিকার বন্ধ না হওয়ার ফলে তুলনামুলক পাখি কম দেখা যাচ্ছে। পাখির আবাসস্থল যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে পাখির সেখানে আসাটা কমে যাবে।

কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, অতিথি পাখি কম আসা মানে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া। ফলে মাছ আর পাখির জন্য যত বেশি অভয়াশ্রম হবে তাতে পাখির সমাগম বৃদ্ধি পাবে। পাখির সমাগম বৃদ্ধি পেলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। তাতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে হাওরের উপর জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মিহির কুমার দো জানান, রবিবার হাওরের নাগুয়া, লরিবাই ও হারাম ডিঙ্গা বিল পরিদর্শন করেছেন। এসব বিলে তিনি মরা কোনো অতিথি পাখি দেখতে পাননি। পাখি নিধন রোধ করতে হলে স্থানীয় জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। এমনিতে হাওর দুর্গম ও বিশাল এলাকা। দুইজন প্রহরি কেন, ১০-২০ জন দিয়েও এত বিশাল এলাকায় পাখির বিচরণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

Comments

comments