গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৬৮ বছরে

মো. সাইফুর রহমান সোহাগ:
শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা, বাঙালি জাতির মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে গড়া সংগঠন, তাঁর জীবন ও যৌবনের উত্তাপে শুদ্ধ সংগঠন, তাঁর সোনার বাংলা বিনির্মাণের কর্মী গড়ার পাঠশালা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বিদ্যার সাথে বিনয়, শিক্ষার সাথে দীক্ষা, কর্মের সাথে নিষ্ঠা, জীবনের সাথে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অতিক্রম করেছে পথচলার ৬৮ বছর। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সময়ের দাবিতে জন্ম হয়েছিল আমাদের প্রিয় এই সংগঠনের। সময়ের প্রয়োজন মেটাতেই এগিয়ে চলা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধের গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের ছয় দশকের সবচেয়ে সফল সাহসী সারথী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রাজপথে ছিল সদা সোচ্চার। উর্দুর বিপক্ষে ধর্মঘটে তিনি ও তাঁর বন্ধুদের কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ছাত্রলীগই প্রথম বাংলা ভাষার জন্য ১০ দফা দাবি উত্থাপন করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য।

১৯৬২ সালে তৎকালীন আইয়ুব খান সরকার কর্তৃক গঠিত শরিফ কমিশন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লক্ষ্য ও স্বার্থের অনুকূলে একটি গণবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল। সেই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গণ-আন্দোলন ও গণজাগরণ তৈরি করে। সেই বাষট্টির রক্তঝরা দিনগুলোতে রক্ত ঝরেছে অসংখ্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর।

বাঙালির স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার সনদ ‘৬ দফা’ বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আস্থা রেখেছিলেন তরুণ ছাত্রনেতাদের উপর। তিনি সে সময়কার ছাত্রনেতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জেলায় জেলায় অবস্থান সুদৃঢ় করে ৬ দফার ব্যাপক প্রচারণা চালাতে। ৬৯’র গণ অভ্যূত্থানেও ছাত্রলীগ ছিল রাজপথে প্রমিথিউস।

একবিংশ শতাব্দির বিশ্বের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের দীর্ঘ পথ চলায় ছাত্রলীগ হারিয়েছে তার সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন, ‘দানবের সাথে লড়াইয়ে যে কোনো পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। ২৩ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তে গঙ্গা বহাইয়া দিব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বাংলার বীর শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি করব না।’

তাইতো মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণের সংগঠনের ১৭ হাজার বীরযোদ্ধা তাঁদের বুকের তাজা রক্তে এঁকেছেন লাল সবুজের পতাকা, এঁকেছেন ৫৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এক সার্বভৌম বাংলাদেশের মানচিত্র। সেই সব বীরযোদ্ধারাই আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি, আমাদের সাহস।

ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর মধ্যে আছে তরুণ মুজিবের নান্দনিকতা ও আদর্শ। আছে কাজী নজরুলের বাঁধ-ভাঙার শৌর্য, আছে ক্ষুদিরামের প্রত্যয়, আছে সুকান্তের অবিচল চেতনা। তাইতো ছাত্রলীগ শিক্ষার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ সুরক্ষায় সবসময় মঙ্গল প্রদীপের আলোকবর্তিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চার দিগন্ত।

যখন বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। ঠিক তখনই বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটিকে নিভিয়ে দিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হিংস্র হায়নার বীভৎস চিৎকারে গর্জে উঠলো ফারুক, রশীদ, মহিউদ্দিন, বজলুল হুদাদের মরণাস্ত্র। পেছন থেকে প্রত্যক্ষ মদদ দিল খন্দকার মোস্তাক আর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ পরবর্তী বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে যে কালো মেঘ গ্রাস করেছিল সে মেঘ সরাতে প্রত্যাশার সূর্য হাতে ১৯৮১ সালে প্রত্যাবর্তন করলেন আমাদের প্রাণের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সেদিন প্রিয় নেত্রীর পাশে ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮৩ সালে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয় ছাত্রলীগ। শিক্ষার অধিকার প্রসারে শামসুল হক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর কমিশনের রিপোর্ট তৈরিতে ছাত্রসমাজের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ।

১৬ কোটি বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুনিপুণ কারিগর, বিশ্বজয়ী নেত্রী, বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত, নারী মুক্তির পথপ্রদর্শক দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ছাত্রলীগ ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি মোকাবেলায় পালন করেছে অগ্রণী ভূমিকা। সেসময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিনে তিনবেলা নিজ হাতে রুটি তৈরি করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সারারাত জেগে প্রস্তুত করেছে খাওয়ার স্যালাইন। সেগুলো পৌঁছে দেয়া হয়েছে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের বন্যাসহ সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ছাত্রলীগ একই কার্যক্রম নিয়ে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ছাত্রলীগ। ২০০২ সালের ২৩ জুলাই বিএনপির পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও ছাত্রদলের নেতারা গভীর রাতে শামসুন্নাহার হলে ঢুকে ছাত্রীদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সেদিন শামসুন্নাহার হলের ছাত্রী বোনদের সম্ভ্রম রক্ষায় ও দোষীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছিল। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বিতর্কিত সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে আটক আমাদের প্রিয় নেত্রীর মুক্তির আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখেছিল।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কাজী নজরুলের কবিতার মতোই,
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তুর্য’
আন্দোলণ সংগ্রামের পাশাপাশি দুস্থ শিশুদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান, বৃক্ষরোপন, পথশিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ পাঠদান কর্মসূচি ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের চর্চা।

১৯৭৩ সালের ৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়ালেও সোনার বাংলা হবে না, যদি বাংলাদেশের ছেলে আপনারা সোনার বাংলার সোনার মানুষ পয়দা করতে না পারেন।’ তাইতো ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী সোনার মানুষ হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিটি দিন শুরু করে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তার সোনালী অতীত ন্যায় সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়বে। আর সেজন্যই দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতাকর্মী তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে সর্বোচ্চ অবদান রাখবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ‘রূপকল্প ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নে প্রযুক্তি দক্ষ ছাত্র সমাজ তৈরিতে ছাত্রলীগ কাজ করছে ও করবে। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ১৯ দফা দাবি পেশ করেছে। ভবিষ্যতেও ছাত্রলীগ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ শিক্ষা সেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকল্পে কাজ করবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

নবীনদের মেধা দেশ গড়ার কাজে লাগুক, স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিধৌত হোক নতুন প্রজন্মের বিবেক ও চেতনা। অনাগত প্রজন্মের লড়াই হোক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আর মুক্তিযদ্ধের স্বপক্ষে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে, সকল অশুভ শক্তিকে পেছনে ফেলে, মুক্তিযদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে, দেশগড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই হোক আমাদের শপথ।

শুভ জন্মদিন
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

Comments

comments