বাকৃবিতে মানুষ ও গবাদিপশুর ব্রুসেলোসিস রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিকার শীর্ষক কর্মশালা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:

আমাদের দেশে গ্রামীণ কর্মশক্তির ২০ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাতের সাথে জড়িত। ৪৪ শতাংশ আমিষ পাওয়া যাচ্ছে এ খাত থেকে। পুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকেও খাতটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চাহিদার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছেনা বিভিন্ন সংক্রামক রোগের কারণে। ব্রুসেলোসিস বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ শিল্পে প্রতি বছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধন করছে।

শনিবার (১০মার্চ) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি অনুষদের মেডিসিন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ‘মানুষ ও গবাদি পশুর ব্রুসেলোসিস: মলিকুলার ডায়াগনোসিস, চিকিৎসা ও প্রতিকার’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বিজ্ঞানীরা। শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় ভেটেরিনারি অনুষদের মেডিসিন বিভাগের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়।

মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. এম. আরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে কর্মশালায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. জসিমউদ্দিন খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভেটেরিনারি অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. প্রিয় মোহন দাস। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্পের কো-ইনভেস্টিকেটর প্রফেসর ড. মো. মকবুল হোসেন। প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং কার্যক্রম সম্পর্কে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মাঝে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ড. এম কাজী কমর উদ্দিন এবং ডা. মোঃ আফতাব হোসেন, ডিডি, ডিএলও, ময়মনসিংহ।

মূল প্রবন্ধে ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ব্রুসেলোসিস ব্যাকটেরিয়া ঘটিত একটি সংক্রামক রোগ। এটি ছোঁয়াচে ও জুনোটিক রোগ যা পশু থেকে মানুষে ও মানুষ থেকে পশুতে ছড়ায়। আক্রান্ত পশুর কাঁচা দুধ, স্বল্প জাল দেওয়া দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে অথবা নির্গত পদার্থের বা আক্রান্ত প্রণীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শে মানুষের এ রোগ হতে পারে। এ রোগে পশুসম্পদের ক্ষতি সাধন এবং মানুষে সংক্রমিত হয়ে পারে অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ব্রুসেলোসিস রোগ গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও শুকরে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে গর্ভপাত ঘটায়। দুগ্ধ উৎপাদন হ্রাস, বাচ্চার মৃত্যু, প্রজননে ব্যাঘাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, জরায়ু প্রদাহ ও প্রজনন ক্ষমতার অক্ষমতার জন্য রোগটি দায়ী।

দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ব্রুসেলোসিস রোগের সনাক্তকরণ, এপিডেমিওলজী, চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে কাজ করে যাচ্ছেন ড. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোন ধরণের ব্রুসেলোসিস আছে তা এখনও জানা যায়নি। আমরা আমাদের গবেষণা দ্বারা বাংলাদেশ কোন ধরণের ব্রুসেলোসিস আছে তা বের করবো, সেইসাথে ব্রুসেলোসিস এর কার্যকর চিকিৎসা ও প্রতিকার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাব।

‘লাইভস্টক ও হিউম্যান ব্রুসেলোসিস’ গবেষণাগার উদ্বোধন

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্ত্যবে উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জসিমউদ্দিন খান বলেন, ব্রুসেলোসিস ব্যাকটেরিয়া ঘটিত একটি সংক্রামক রোগ। এটি ছোঁয়চে রোগ যা পশু থেকে মানুষে এবং মানুষ থেকে পশুতে ছড়ায়। এটি একদিকে পশুসম্পদের যেমন ক্ষতি সাধন করে তেমনি মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয়ে তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই এ রোগ নিয়ে গবেষণা বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। আমি আশা করি, এ গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

এর আগে ব্রুসেলোসিস নিয়ে উন্নত গবেষণার জন্য মেডিসিন বিভাগে ‘লাইভস্টক ও হিউম্যান ব্রুসেলোসিস’ নামের একটি নতুন গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গবেষণাগারটি উদ্বোধন করেছেন কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের মৎস্য ও প্রাণিস¤পদের প্রাগ্রাম ডাইরেক্টর ড. কাজী এম. কমর উদ্দিন। এটিই বাংলাদেশের প্রথম গবেষণাগার যা শুধুমাত্র ব্রুসেলোসিস নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ থেকে ব্রুসেলোসিস নিধনে এটি সম্ভাবনার একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত করবে। যেখানে মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় মেডিকেল কলেজের সাথে যৌথভাবে তিন বছর মেয়াদী গবেষণা কার্য চালনা হবে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ডা. নুরুল আমীন বাশারসহ পিএইচডি ফেলোগন প্রকল্পে সহায়তার জন্য কাজ করবেন।

এ সময় ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, গবেষক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রিমাউন্ট ভেটেরিনারি ফামর্স কোরের কর্মকর্তা, মানুষ ও গবাদিপশুর ওষুধ ও টিকা উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির কর্মকর্তাসহ মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

Comments

comments