বাকৃবি উদ্ভাবিত ‘বাউ-ব্রো’ ব্রয়লারে দেশি মুরগির স্বাদ

মো: অাব্দুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
প্রায় এক দশক আগে দেশে ব্রয়লার মুরগির ব্যাপকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। কম সময়ে অধিক উৎপাদন, স্বল্পমূল্য এবং দেশি মুরগির সহজলভ্যতার অভাবে ব্রয়লার মুরগি জনপ্রিয়তা পায়। তবে নরম মাংস এবং বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অধিক প্রয়োগের জন্য অনেকে ব্রয়লার মুরগি এড়িয়ে চলেন। অপর দিকে কম উৎপাদন ও বেশি দাম হওয়ার কারণে দেশি মুরগি ভোক্তাদের কাছে তত সহজলভ্য নয়।

এ পরিস্থিতিতে উদ্ভাবিত বাউ-ব্রো জাতের মুরগিতে দেশি স্বাদ পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আশরাফ আলী এবং ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা দীর্ঘদিন গবেষণা করে ‘বাউ-ব্রো সাদা’ এবং ‘বাউ-ব্রো রঙিন’ জাতের মুরগি উদ্ভাবন করেছেন। মুরগির জাত দুটি এখন টেকসই প্রযুক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।

রোববার দুপুরে বাউ-ব্রো মুরগি সম্প্রসারণ ও বিপণনের ওপর কর্মশালা এবং মতবিনিময় অনুষ্ঠানে উদ্ভাবিত মুরগির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের কাজি ফজলুর রহিম সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠানটি হয়। অনুষদের ডিন এবং উদ্ভাবক প্রফেসর ড. মো. আশরাফ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপাচার্য প্রফেসর মো. আলী আকবর উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে ঢাকার পল্লীকর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক শরীফ আহমেদ চৌধুরী, ঢাকার কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি পরিচালক ড. কাজী এম কমরউদ্দিন এবং বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক প্রফেসর ড. এম. এ. এম. ইয়াহিয়া খন্দকার উপস্থিত ছিলেন।

কর্মশালায় উদ্ভাবিত জাত নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. আশরাফ আলী। তিনি বলেন, ‘প্রচলিত ব্রয়লারের প্রতি অনেক ভোক্তার অনাগ্রহের কারণে ২০০৯ সালে গবেষণা শুরু করি। ২০১৪ সালে নতুন দুটি জাতের সঙ্গে দেশবাসীকে পরিচয় করিয়ে দিই। এ পর্যন্ত আরও গবেষণা করে আমাদের উদ্ভাবিত মুরগির জাত দুটিকে টেকসই প্রযুক্তি হিসেবে দাঁড় করেছি।’

তিনি জানান, রঙিন জাতটির মাংসের স্বাদ ও রং একেবারে দেশি মাংসের মতো। আর সাদা জাতটির মাংস ব্রয়লারের চেয়ে শক্ত ও মুখরোচক। সাদা জাতটির উৎপাদন খরচ গড়ে কেজি প্রতি ৮৬ টাকা এবং রঙিন জাতটি কেজিপ্রতি ১০৯ টাকা। আর বাজারে জাত দুটির বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি যথাক্রমে ১২৫ ও ১৬০ টাকা।

আরেক গবেষক ড. বজলুর রহমান মোল্যা বলেন, ব্রয়লারের মতো মুরগির বাচ্চা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না খামারিদের। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশেই সাশ্রয়ী দামে বাচ্চা উৎপাদন করা যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা ছাড়া জাত দুটিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নেই। নয়টি জেলায় বিভিন্ন খামারে এই মুরগিগুলো পালন করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গত দুই বছরে ৭৫ জন খামারিকে এই মুরগি লালন-পালনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন দরকার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জাতগুলো সম্প্রসারণ ও বিপণন।

দুই বছর ধরে বাউ-ব্রো জাতের মুরগি উৎপাদন করছেন জামালপুর জেলার নান্দিনার খামারি মো. হামিদুর রহমান। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, খামারিরা কম দামে বাচ্চা পাচ্ছেন। যাঁরা বাজারে দেশি মুরগি খোঁজেন, তাঁদের বাউ-ব্রো জাতের মুরগি কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

কর্মশালা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিজ্ঞানী ও গবেষক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি পোলট্রি খামারের কর্মকর্তা, ডিম ও মুরগি উৎপাদনকারী খামারি উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বাকৃবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর বলেন, প্রচলিত ব্রয়লার দিয়ে দেশি মুরগির মাংসের চাহিদা মেটানো কঠিন। এ জায়গা থেকেই গবেষকেরা জাত দুটি উদ্ভাবন করেছেন। দেশে বাচ্চা উৎপাদন এবং দেশীয় আবহাওয়ায় পালনযোগ্য এ জাত দুটি খুব কম সময়ে জনপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করা যায়। এতে দেশি মুরগির স্বাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

Comments

comments