কুঁচিয়া চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নীলফামারীর বেকার যুবকদের

নীলফামারী প্রতিনিধি:
যোগেশ চন্দ্র, বাবলু, চঞ্চলসহ এলাকার আরো অনেকে আছেন যাদের মাস খানেক আগে ছিল না তেমন কিছু। কর্মহীনতার মাঝে সামন্য দিন মজুরী হিসেবে চলতো তাদের সংসার। কিন্তু এখন তারা স্বপ্ন দেখছেন। কুঁচিয়া চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তারা। এদের অনেকেই আবার কুঁচিয়া মাছ চাষ করে অনেকটা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে।

নীলফামারী জেলার সোনারায় ইউনিয়নের বেড়াকুটি গ্রামে বেসরকারি সংস্থা সেলফ হেল্প এন্ড রিহেবিলিটেশন প্রোগ্রাম’র লিফট কর্মসূচির আওতায় এবং পিকেএসএফ’র সহযোগিতায় এখানকার কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়া মাছের চাষাবাদ শুরু করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাটু পানিতে ১৫ ফিট স্কয়ার করে জায়গা নিয়ে ৬/৭টি ছোট ছোট ডিচে চাষাবাদ হচ্ছে কুঁচিয়া মাছ। আর তার পাশে কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে কেঁচোর খামার।

মূলত শার্পের লিফট কর্মসূচির আওতায় ও পিকেএসফ’র সহযোগিতায় বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়া চাষের জন্য ৬০ জন কৃষককে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কর্মহীনতার মাঝেও স্বাবলম্বী হতে পারেন।

সাপের মতো দেখতে মনে হলেও কুঁচিয়া এক প্রকার মাছ। যার বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে (Moneptorus Cuchia)। অনেকেই কুঁইচ্চা, কুঁচো, কুঁচা বলেও চেনে। সাধারণত খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, ধানক্ষেত ও প্লাবিত অঞ্চলে কুঁচিয়া মাছের দেখা মিললেও বর্তমানে এসব জলাভূমিগুলো দূষিত ও বিনষ্ট হওয়ায় কুঁচিয়া মাছ ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে।

বিলুপ্ত প্রায় এ কুঁচিয়া মাছের চাষাবাদ বর্তমানে একুয়াকালচার ও প্রাকৃতিক জলজ ব্যবস্থাপনা এ দুই পদ্ধতিতে শুরু করেছে এলাকার কৃষকরা।

একুয়াকালচার পদ্ধতিতে নির্মিত একটি ০.৫ আয়তন বিশিষ্ট ডিচে তারা প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১০০টি পোনা ছেড়েছেন এবং খাবার হিসাবে দেওয়া হয়েছে তেলাপিয়া বা কার্প মাছের পোনা।

প্রাকৃতিক জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে কুঁচিয়া মাছের ডিমের আকার বড় এবং সংখ্যায় কম হওয়ায় প্রাকৃতিক জলজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে এর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে পোনা উৎপাদন ও মাছ বড় করে বাজারজাত করা হয়।

যদিও এখানকার কৃষকরা একুয়াকালচাল পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছেন। চাষী যোগেশ জানান, আগে ক্ষেতে কাজ করতাম। এখন কুঁচিয়া চাষে লাভবান হচ্ছি। অল্প খরচে ছোট পুকুরেই চাষ হচ্ছে কুঁচিয়া। সাথে চাষ হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

একই কথা জানান এলাকার অন্যান্য কৃষকারা। পুকুরের মধ্যে পাড় করে ডিচে ২ থেকে ৩ ফিট গভীর পানিতে চাষাবাদ হচ্ছে কুঁচিয়া মাছের।খরচও কম পড়ে চাষাবাদে বলে জানান কৃষক বাবলু।

কুঁচিয়া মাছ ডিম কম দেয় বলে কৃত্রিম প্রজননের তেমন সুযোগ থাকে না। তাই প্রাকৃতিক প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনের পথ বেছে নিতে হয়। সেলফ হেল্প রিহেবিলিটেশন প্রোগ্রাম’র লিফট কর্মসূচির মৎস্য কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, মূলত দিন মজুর, কর্মহীন চাষীদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে আমরা এ প্রকল্প হাতে নিয়েছি। চাষীদের আমরা বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুকুর পাড় তৈরির জন্য বাঁশের বেড়া, পলিথিন, নেট, চোং, মাটির হাড়ি সরবরাহ করছি।

কুঁচিয়া মাছের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্পর্কে তিনি বলেন, মূলত এ কুঁচিয়া এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। একটি পূর্ণ বয়স্ক কুঁচিয়া মাছ ২ হাজার পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। পূর্ণাঙ্গ একটি কুঁচিয়ার ওজন ৩০০/৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে।

কুঁচিয়া মাছ কাদায় পট করে বাস করে। কুঁচিয়া সাধারণ খাবার হিসাবে জীবন্ত ছোট মাছ, কীটপতঙ্গ, কেঁচো খেতে পছন্দ করে বলে পানিতে কুঁচিয়ার পাশাপাশি ছোট মাছও ছাড়া হয়েছে। কুঁচিয়া মাছ চাষ করে চাষীরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারে এজন্য চাষীদের সঠিক দিক নির্দেশনার পাশাপাশি সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে জানান শার্পের নির্বাহী পরিচালক মাহাবুব উল আলম।

তিনি বলেন, গৃহিত লিফট কর্মসূচির মাধ্যমে এরকম চাষীদের এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছি আমরা।

সৈয়দপুর সাধুপানি উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রাশিদুল হক কুঁচিয়া মাছের ওষুধি গুণ সম্পর্কে বলেন, কুঁচিয়া মাছ রক্তশূন্যতা পূরণের পাশাপাশি শারীরিক দুর্বলতা, এজমা, ডাইবেটিস, বাতজ্বরসহ অনেক রোগের মহৌষদের মত কাজ করে। তাছাড়া ধান ক্ষেতের ফসল অনিষ্টকারী পোকা লার্ভা, শামুক খেয়ে কুঁচিয়া কৃষকের উপকারী বন্ধু হিসেবেও কাজ করে। এটি শরীরের বিভিন্ন ব্যথা দূর করে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, হজম শক্তির ক্ষমতা বাড়ায়।

আশপাশ এলাকায় একুয়াকালচার পদ্ধতিতে কুঁচিয়া চাষের জন্য যে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে সরকারি পর্যায় থেকে সব ধরনের সহযোগিতাও করা হবে বলে জানান তিনি।

বিদেশেও এ মাছের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০১৪-১৫ সালে যেখানে কুঁচিয়া রপ্তানী হয়েছিল ৫০ হাজার টন, সেখানে ২০১৭ সালে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ হাজার টন। এতে বাংলাদেশ শুধুমাত্র কুঁচিয়া চাষ করে ২ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।

Comments

comments