একজন সূর্য বেগমের আলোয় আলোকিত পায়রাবন্দ

রংপুর প্রতিনিধি:
সহায় সম্বলহীন পরিবারের গৃহিনী সূর্য বেগম। স্বামী-সন্তান নিয়ে এক সময় না খেয়ে থাকতেন। বাড়ির স্বল্প পরিসরে পতিত জমিতে শাক-সবজি, মাছ ও কম্পোস্ট সার তৈরি করে দারিদ্র বিমোচনে এক অভাবনীয় সাফল্য এনেছেন তিনি। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হওয়ায় সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জাতীয় কৃষি পুরস্কার ও বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে। তার বাড়িটি এখন কৃষি শিক্ষার মাঠ স্কুল ও গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ধারে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে তার বাড়ি। স্বামী আজিজুল ইসলাম ছিলেন রাইস মিল মালিক। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে ঋণে জর্জরিত হয়ে লোকসানের কারণে ১৯৯৩ সালে মিলটি বন্ধ করে দেন। স্ত্রী ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কাটাতে হয়ে জীবন। এক পর্যায়ে মিলটি বিক্রি করে দিয়ে ঋণ পরিশোধ করেন আজিজুল। এরপর থেকে সংসারে নেমে আসে চরম অভাব-অনটন। কোনো উপায়ও খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।

অবশেষে ১৯৯৮ সালের দিকে চুহড় কৃষি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার হামিদুর রহমান ওই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। তিনি সূর্য বেগমের বাড়ির স্বল্প জায়গায় মৌসুমি সবজি চাষের পরামর্শ দেন। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ শুনে এগিয়ে আসেন আজিজুলের স্ত্রী সূর্য বেগম। তার পরামর্শে সবজি উৎপাদন করে অল্প দিনেই অভাব দূর করেন সূর্য বেগম। তিনি চালের মিলের চাতাল ভেঙ্গে ফেলেন। সেখানে পেঁপে, শিম, আদা, লাউ, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ শুরু করেন। পাশাপাশি কম্পোস্ট সার তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। পরের বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে দারিদ্র বিমোচনের জন্য একটি মডেল কার্যক্রম গ্রহন করেন। এ কার্যক্রমে তার লক্ষাধিক টাকা আয়ও হয়। ধীরে ধীরে সূর্য বেগম কয়েক খণ্ড জমিও কেনেন। এভাবে তিনি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেন।

তার বাড়ি এখন কৃষি ক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় মডেল। তার কার্যক্রম এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা উদ্বুদ্ধকরণ টিমের সদস্য, চাষী, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে যাচ্ছেন সূর্য বেগমের বাড়ি থেকে। এ সাফল্যের জন্য ২০০২ সালে সূর্য বেগম রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জাতীয় কৃষি পুরস্কার লাভ করেন। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি গ্রহন করে সাফল্য অর্জন করায় সরকার ২০১২ সালে ভিয়েতনাম ভ্রমণে পাঠায় সূর্য বেগমকে। বর্তমানে তিনি গুচ্ছ গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি নিজে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এবং মোটিভেশনাল ট্যুরের লোকজন এসে সূর্য বেগমের বাড়িতে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

সুর্য বেগমের চার ছেলে দুই মেয়ে। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি মায়ের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করছেন। কঠোর পরিশ্রম করে স্বাবলম্বী সূর্য বেগম বলেন, আমার মত অসহায় ও দুস্থ্য পরিবারগুলোর মেয়েরা কৃষি প্রযুক্তি কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সাফল্য এনে দেশকে দ্রুত সমৃদ্ধশালী ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি দেশের সব নারীকে এভাবে এগিয়ে আসার আহবান জানান। তাহলেই নিজের এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন হবে।

পায়রাবন্দ এলাকার ব্যবসায়ী কাওছার আলী ও মোর্শেদ আলম বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন আসছে আমাদের এলাকায় সূর্য বেগমকে দেখতে। রংপুর অঞ্চলে এখন এক নামেই সূর্য বেগমকে সবাই চেনে। তার জন্যই আলোকিত হয়েছে পায়রাবন্দ।

মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ চুহড় ব্লকের সম্প্রতি অবসরে যাওয়া উপ-সহকারী কৃষি অফিসার হামিদুর রহমান বলেন, সূর্য বেগমের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমি আনন্দিত। তিনি এখন অনুকরনীয়।

মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, সূর্য বেগম নারী জাতির একজন অনুকরণীয় রোল মডেল।

সূত্র: সমকাল

Comments

comments