দিনাজপুর থেকে নাসায় হাবিপ্রবির ৪ শিক্ষার্থী

দিনাজপুর প্রতিনিধি:
আপনি কি জানেন? বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ২৫%- এর বেশি মানুষের নিরাপদ পানির সংস্থান নেই। হ্যাঁ। আর এই পানির দূষণে কত প্রকার রোগ যে তৈরি হচ্ছে তা কি জানেন? মার্কিন বিজ্ঞানীদের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। পৃথিবী খুব দ্রুতই একটি প্লাস্টিক গ্রহে পরিণত হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত উৎপাদিত প্লাস্টিকের পরিমাণ ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন। গত ৬৫ বছরে এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক তৈরি হয়েছে। প্লাস্টিকের অধিক উৎপাদন এবং এর দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

মাটি এবং পানিকে ভয়াবহভাবে দূষিত করছে প্লাস্টিক। এমনকি নদী এবং সাগরও প্লাস্টিক পণ্যে দূষিত হচ্ছে। যেহেতু প্লাস্টিক পণ্য পচনশীল নয়, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপ প্রয়োগ করে এগুলো নিঃশেষ করতে হবে। আর এই বিশাল পরিমাণ উৎপাদিত প্লাস্টিকের প্রায় ৭৯ শতাংশই ছড়িয়ে পড়েছে খোলা প্রকৃতিতে। প্লাস্টিক বর্জ্যে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। এই তো গেল সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি। এবার একটু দেশের দিকে এক পলক দেখে নেওয়া যাক। স্বাধীনতার ৪৬ পর পার গত হয়েছে। কিন্তু আমরা বুড়িগঙ্গা, হাজারীবাগ-কে এখন পর্যন্ত ময়লা থেকে মুক্ত করতে পেরেছি! না, এখনো পারিনি। কারণ, আমরা কেউই এ নিয়ে স্বপ্ন পর্যন্ত দেখিনি। কিন্তু এই স্বপ্নটাই দেখেছে আমাদের দেশের কিছু তরুণ ছেলেমেয়ে।

এ নিয়ে তারুণ্যের ভাবনাটা কী? তাদের সঙ্গেই কথা বলে জানা গেল বিস্তারিত। হাবিপ্রবির দল বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে তারই একটি নজির। তাদের ভাষ্যমতে, ‘সৌরশক্তি দ্বারা চালিত বড় একটা জাহাজ তৈরি করা হলো। যার সঙ্গে থাকবে কতগুলো ছোট ছোট রোবট। আর জাহাজটি বিশ্ব গবেষণা সংস্থা নাসার ডাটাবেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে। তথ্যগুলো হবে কোন কোন এলাকায় পানিতে কী পরিমাণ আবর্জনা রয়েছে বা কোন শহরের পানি কতটুকু দূষিত। এমনকি কোন সাগরের পানি প্লাস্টিকের মতো দূষিত পণ্যের কারণে হারাচ্ছে তার স্বকীয়তা। তারপর জাহাজের ছোট রোবটগুলোকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হবে। রোবটগুলোর কাজই হবে পানি থেকে সব ময়লা-আবর্জনা একত্রিত করা। এরপর রোবটগুলো আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যগুলোকে পুড়িয়ে সেখানেই স্তূপ করে রাখবে এই কামলাখাটা রোবটগুলো। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, একটা জাহাজ আর কতটুকু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করবে?

উত্তরটাও নেহায়েত কঠিন নয়। খুবই কম। কিন্তু যদি এরকম হাজারটা অথবা লাখো জাহাজ সাগরে বা নদীতে ছাড়া হয় তাহলে পানিতে কি আগের মতো ময়লা-আবর্জনা থাকবে? তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, এই পদ্ধতিতে বিশ্ব পরিমণ্ডলের পানিতে ময়লা-আবর্জনা অনেকাংশে কমে আসবে। এরকম আইডিয়া নিয়েই কাজ করছে ‘হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Team Englitas’। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীরা বিশ্ব গবেষণা কেন্দ্র নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৭-এ লড়াই করে ৫ম স্থান দখল করেছে। তাদের এই যাত্রা সহজ ছিল না। কেননা, নাসার এই প্রতিযোগিতার আপাদমস্তক পুরোটাই হয়েছিল অনলাইন ভোটিংয়ের মাধ্যমে। নাসার প্রতিযোগিতায় প্রস্তাবিত প্রজেক্টে পিপলস চয়েজ অপশন ছিল, যা পুরোটাই ছিল অনলাইন ভোটিং।

হাবিপ্রবির Englitas টিমের সদস্য খন্দকার তৌকির প্রান্ত জানান, ‘নাসার ওই প্রতিযোগিতায় আমরা একটি সুন্দর বিশ্ব গড়ার পরিকল্পনা উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশ তো বটেই, সারা বিশ্বের দিকে নজর দিলেই দেখবেন বিশ্বায়নে এখন পরিবেশের ক্ষতিকারক অনেক উপাদান বেড়েছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে নানা ময়লা-আবর্জনায়। এর মধ্যে প্লাস্টিক দ্রব্যাদিও কম নয়। আমাদের প্রকল্পে আমরা রোবোটিক যন্ত্রের সাহায্যে তথা ছোট ছোট রোবটের সাহায্যে এসব ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে সক্ষম হব। আমাদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এমন প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিশাল বাজেট। ভবিষ্যতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খাল-বিল, নদী-নালা এমনকি সাগরও পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পাবে।’

এমন একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক এই তরুণরা জানায়, ভবিষ্যতে সবার সাপোর্ট পেলে হাবিপ্রবির ‘Team Englitas’ এগিয়ে যাবে আরও অনেক দূর। বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবে ‘হাবিপ্রবি’র নাম তথা বাংলাদেশের নাম।

হাবিপ্রবির ভিসি প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম বলেন, এটি সত্যিই একটি বড় সুসংবাদ যে হাবিপ্রবির দল বিশ্বব্যাপী সম্মানজনক প্রতিযোগিতায় লড়ে সেরা পাঁচের তালিকায় লিখেছে তাদের নাম। বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছে এক অনন্য উচ্চতায়। আমরা চাই হাজী দানেশের নাম নাসায় লেখা থাকুক অনেক দিন, ‘Team Englitas’ তাদের প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্ট করে বাংলাদেশসহ অন্য দেশের পানি দূষণ রোধ করুক।’

নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৭-এর প্রতিযোগিতা কীভাবে হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে Englitas টিমের দলনেতা আহম্মেদ অনন্য মাসুদ বলেন, ‘চূড়ান্ত পর্বে অনলাইনের ভোটের মাধ্যমে ৫টি দলের মধ্যে একটি দলকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে দিনাজপুর হাবিপ্রবির টিমকে অনলাইন ভোটিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। আর দলকে বিজয়ী করতে অনলাইনে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন দলের সদস্যরা। প্রজেক্টটি সম্পর্কে আমরা সব শিক্ষার্থী এবং সাধারণকে ভোটদানে উৎসাহিত করতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে গত ১ জুন দিনাজপুর প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনও করেছিলাম। আর তাতেই ‘Team Englitas’ অভূতপূর্ণ সাড়াও পায়। তাই তো বিশ্বের সর্বোচ্চ গবেষণা সংস্থা নাসার স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে লড়াই করে সেরা পাঁচের তকমা লাগাতে খুব সমস্যা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আয়োজনে গত ২৯-৩০ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত NASA Space Apps Challenge ২০১৭ হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা। নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৭-এর ১৪৭টি দেশের মোট ১ হাজার দল অংশ নেয়। হ্যাকাথনে (প্রতিযোগিতা) পিপলস চয়েজ ক্যাটাগরিতে দিনাজপুরের হাবিপ্রবির এই দলটি জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করে। বর্তমানে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ‘ইংলাইটাস’ সেরা পাঁচে নিজেদের অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের আঞ্চলিক পর্বে মোট ১১টি প্রকল্প চূড়ান্ত পর্বের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে তার মধ্যে হাবিপ্রবির ইংলাইটাস দলের প্রকল্পও রয়েছে।

হাবিপ্রবির চারজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে গঠিত ইংলাইটাস দলটি নদী দূষণের মূল কারণ ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা জন্য রোবট আবিষ্কার করার প্রজেক্ট প্রতিযোগিতায় তুলে ধরে এবং সেরা ৫-এ স্থান পায়। বর্তমানে দলটি এমন সম্মানে দারুণ খুশি। Englitas টিমের দলনেতা আহম্মেদ অনন্য মাসুদ আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত পর্বে বিজয়ী হওয়ার জন্য পিপলস্ অনলাইনে আগামী ৫ জুন পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভোটাররা নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে ভোট দিয়ে আমাদের বিজয়ীর তালিকায় রেখেছেন। আমরা আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের সঙ্গে লড়াইয়ে ছিল ভারত, কসোভো এবং সাইপ্রাসের প্রকল্পও। পিপলস্ চয়েস বিভাগের ভোটিং সরাসরি বিচারকরা পর্যালোচনা করেছিলেন।

দলের সদস্য মৌরী সামাদ মৌ বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা সবার সাপোর্ট পেলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব। বিশ্বের দরবারে আবারও তুলে ধরতে চাই হাবিপ্রবির নাম তথা বাংলাদেশের নাম। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল ১৪৭টি দেশের হাজার দলকে। যেখানে সেরা পাঁচের মধ্যে চূড়ান্ত ভোট পর্বে বাংলাদেশের পাশাপাশি ছিল কসোভো, ভারত ও সাইপ্রাসের নাম। হাজী দানেশকে বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় করানোই আমাদের উদ্দেশ্য, আমাদের ভার্সিটিই আমাদের পরোক্ষভাবে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেন্স ২০১৭-তে সেরা পাঁচে হাবিপ্রবি। Englitas টিমের সদস্যরা হলেন তানভীর আহমেদ শাওন (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, লেভেল ২, সেমিস্টার ১), খন্দকার তৌকির হোসেন প্রান্ত (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, লেভেল ২, ১), অনন্য মাসুদ (ইইই, লেভেল ৩, ১) এবং মৌরী সামাদ মৌ (সিএসই, লেভেল ৩, ১)।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Comments

comments