বৈসাবি উৎসবে মেতেছেন পাহাড়ি জনপদ

বান্দরবান সংবাদদাতা:

বৈসাবি উৎসবে মেতেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের চার সম্প্রদায়ের লোকজন। নতুন বাংলা বছরকে বরণ ও পুরাতন বছরকে বিদায়ের উৎসবকে তারা ভিন্ন নামে পালন করে আসছেন বহুকাল ধরে। মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং চাকমাদের ভাষায় বিজু’র সংক্ষেপিত রূপ হচ্ছে বৈসাবি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এ চার সম্প্রদায়ের এই প্রধান সামাজিক উৎসবকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় বৈসাবি।

১২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় বালাঘাটামুখ ঘাটে সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে বান্দরবানে চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু এবং তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব শুরু হয়েছে। ফুল ভাসানোয় চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর ও নারী-পুরুষেরা অংশ নেন। পরে বালাঘাটা স্কুলমাঠে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐহিত্যবাহী ঘিলা খেলা অনুষ্ঠিত হয়।

বিষু উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঘিলা হচ্ছে জঙলি লতায় জন্মানো এক প্রকার বীজ বা গোটা। ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নানা কাজে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় বস্তু। তঞ্চঙ্গ্যার সম্প্রদায়ের বিশ্বাস–ঘিলার লতায় ফুল থেকে বীজ জন্মালেও এর ফুল পবিত্র ‘দেবংশি (স্বর্গীয়) বস্তু’ হওয়ায় সাধারণ মানুষ ঘিলা ফুলের দেখা পান না।

কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যা জানান, শুধু যারা মহামানব হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন তারাই একমাত্র ঘিলা ফুলের দেখা পান। ফুলের পরিবর্তে ঘিলা পবিত্র হিসেবে সংগ্রহ করে রাখেন তঞ্চঙ্গ্যারা। ঘিলা বাড়িতে রাখলে বজ্রপাত, বিপদ ও অপদেবতা বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং  ঘিলা খেলার উদ্বোধন করেন। ঘিলা খেলা টুর্নামেন্টে ৩২টি পাড়ার তরুণ-তরুণী দল অংশগ্রহণ করেছে। এ ছাড়াও বয়স্কপূজা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে।

বিজু উৎসব কমিটির সদস্য বিকাশ চাকমা জানান, নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তাদের বিজু উৎসব শুরু হয়। এ ছাড়াও চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলা নাটিং এবং বাঁশহরম প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক আয়োজনও রয়েছে।

মারমা প্রধান জেলা বান্দরবানে ‘অতীতের ব্যর্থতা আজ মুছে দিয়ে যায়, নতুনের অঙ্গীকার আর উদ্দীপনায়’ এই প্রতিপাদ্যে ১৩ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল ৮টায় পুরাতন রাজবাড়ি মাঠ থেকে ‘আপন ঐতিহ্যে সাজো: বর্ণাঢ্য সাংগ্রাই’ র‌্যালির মাধ্যমে চার দিনব্যাপী উৎসব শুরু হবে।

র‌্যালির নেতৃত্ব দিবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং। র‌্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজবাড়ি মাঠে গিয়ে শেষ হবে। র‌্যালিতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, চাক, খেয়াং, খুমি, বম, লুসাই, পাঙ্খোয়া সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী এবং শিশু-কিশোরসহ নারী-পুরুষেরা অংশ নেবেন।

র‌্যালি শেষে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে শিশু-কিশোরদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা এবং ১১টায় বয়স্কপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পরের দিন ১৪ এপ্রিল, শনিবার দুপুর আড়াইটায় উজানীপাড়াস্থ সাঙ্গু নদী চরে অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি স্নান। রাজগুরু কিয়াং হতে সারিবদ্ধভাবে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা (ভান্তেরা) কষ্টি পাথর এবং স্বর্ণের বৌদ্ধমূর্তি সহকারে হেঁটে নদীর চড়ে গিয়ে সমবেত হবেন।

সেখানে সম্মিলিত প্রার্থনায় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোররা অংশ নেবেন। রাতে সাড়ে দশটায় শুরু হবে উজানীপাড়াস্থ বিসিক গলি, মধ্যমপাড়াস্থ ছয় নম্বর গলি, জাদীপাড়া গলিসহ বিভিন্ন মহল্লায় তরুণ-তরুণীদের পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা। রাতব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় তরুণ-তরুণীরা হরেক রকমের পিঠা তৈরি করে পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে বিতরণ করবেন।

সাংগ্রাই উৎসবের মূল আকর্ষণ–মৈত্রী পানিবর্ষণ জলকেলি উৎসব অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৫ ও ১৬ এপ্রিল বিকেলে জেলা শহরের পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে, সদর উপজেলার রেইছাথলি পাড়া, রোয়াংছড়ি উপজেলার হাইস্কুল মাঠে তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠবে জলকেলি বা পানি খেলায়। জলকেলি উৎসবে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ভাবের আদান-প্রদান করে।

জলকেলির আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে–পানি খেলায় বিবাহিত নারী-পুরুষরা অংশ নিতে পারেন না। জলকেলি উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা সর্ম্পকের সেতুবন্ধন তৈরি করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটায় পুরাতন রাজবাড়ি মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মারমা শিল্পীগোষ্ঠীসহ স্থানীয় শিল্পীগোষ্ঠীরা নাচ-গান পরিবেশন করবেন।

এ ছাড়াও সন্ধ্যা ৭টায় রাজগুর বৌদ্ধ বিহারসহ (ক্যায়াং) বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারগুলোতে হাজারো মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বালন করা হবে। সে সময় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় হাজারো পাহাড়ি নারী-পুরুষরা প্রার্থনায় অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি কোকোচিং মারমা।

Comments

comments