বজ্রপাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে আমিরের যন্ত্র

বগুড়া প্রতিনিধি:
বজ্রপাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন বগুড়ার যন্ত্র বিজ্ঞানী আমির হোসেন। তার এ গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বজ্রপাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে তা বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি। আমির হোসেনের মতে, সুউচ্চ টাওয়ারের মাধ্যমে সুপার হাই-ফ্রিকোয়েন্সি মাইক্রোওয়েভ চুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে বজ্রপাত থেকে বিপুল পরিমাণ তড়িৎ শক্তি ধারণ করা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তিতে ক্যাপচার করে জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতির শতভাগ পূরণ করে বহির্বিশ্বে রফতানি করাও সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বজ্রপাত সৃষ্টিকর্তার সুপরিকল্পিত সৃষ্টির মাঝে একটি অদৃশ্য শক্তির অসাধারণ ঘটনা। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য বজ্রপাত প্রাকৃতিক চার্জ হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিকভাবে বাতাস যখন জোরে ছুটে আসে তখন তার মধ্যে উৎক্ষেপ থাকে। এই উৎক্ষেপ থেকে মেঘের ওপরের অংশে পজিটিভ বিদ্যুৎ আর নিচের দিকে নেগেটিভ বিদ্যুৎ জমতে থাকে। এই দুই বিদ্যুৎবাহী মেঘ কাছাকাছি এলেই একটির পজিটিভ ও অন্যটির নেগেটিভ মিশে যায়। তখন যে আলোর ঝলক দেখা যায়, সেটাকেই আমরা বলি বিদ্যুৎ চমকানি। মেঘের নিচের স্তরে ঋণাত্মক চার্জ থাকে যা পৃথিবী পৃষ্ঠের ধনাত্মক চার্জে আকৃষ্ট হয়, ফলে পৃথিবী পৃষ্ঠ ও মেঘ স্তরের মধ্যে প্রচণ্ড বিদ্যুৎ বিভর ঘটে। পৃথিবী পৃষ্ঠের উঁচু টাওয়ার, দালান-কোঠা, গাছ-পালা, সুপরিবাহী বস্তু পেলেই মেঘের ঋণাত্মক চার্জ আকর্ষণ করে এবং বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে মাটিতে পড়ে।

দুই চার্জের মিলনে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয় এবং ভয়াবহ তাপ উৎপন্ন হয়। তাপ প্রায় ৩০-৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট হয়। বজ্রপাতের সাপাটা দ্রুতগতিতে ভূপৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হলে আশপাশের শীতল বাতাস প্রচণ্ড তাপে হালকা হয়ে তীব্রগতিতে দূরে সরে যায়। ফলে প্রচণ্ড শব্দ এবং বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতের শব্দ শোনার আগে আলোর ঝলকানি দেখার কারণ হচ্ছে, বায়ুতে আলোর বেগ সেকেণ্ডে ৩ কোটি মিটার প্রায় এবং শব্দের বেগ মাত্র ৩৩০ মিটার। শব্দ শোনার সময়কে ৩৩০ দিয়ে গুণ করলে বজ্রপাতের উৎসের দূরত্ব বের করা যায়।

সাধারণত ১৫০০ মিটার থেকে ১০ হাজার মিটার ওপরে বজ্রপাতের উৎস থাকে প্রতি মুহূর্তে আবহাওয়া মণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ার বা আয়নোস্ফিয়ার অঞ্চলে ১৮০০টি বজ্র ঝড় জন্ম নেয়। প্রতি সেকেন্ডে ৬ শত বার বজ্রঝড় ঘটে, এর মধ্যে প্রায় একশোর মতো বজ্রপাত পৃথিবীর সংস্পর্শে আসে। আবার জলীয় বাষ্প ঘণীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় বায়ু ও অন্য জলীয় কনার সাথে ঘর্ষণের ফলেও এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুৎতিক চার্জের আধারের মতো আচরণ করে।

ওই মুহূর্তে ওই বিদ্যুৎ ক্যাপচারের সময় আমির হোসেনের বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বজ্রপাত থেকে উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ তড়িৎ শক্তিকে সংরক্ষণ করা যাবে। বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ৪ (চার) হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট। ঘণ্টায় প্রায় ২ লাখ ২ হাজার কিলোমিটার গতিবেগ থাকে। বজ্রপাতের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার থেকে ৮০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ১০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এতে ১০ কিলো থেকে এক কোটি পর্যন্ত ভোল্ট থাকে। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ৫০ থেকে ১৫০টি বজ্রপাত হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে বজ্রপাতের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। পৃথিবীর উপরিতলের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ে ৪০ শতাংশ।

আমির হোসেন বলছেন, বজ্রপাতকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি স্থাপনের জন্য সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে দেশে বিদ্যুৎঘাটতি পূরণ করে বিদেশে রফতানি করা যাবে। সেইসঙ্গে প্রতি বছর বজ্রপাতে শত শত মানুষ অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, আমার এ প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি কাজ করা যায় তাহলে বজ্রপাত থেকে বিদ্যুৎ ক্যাপচার করা সম্ভব, তার জন্য যা করতে হবে সারা বাংলাদেশে বিশেষ কিছু জায়গায় ভৌগোলিক অবস্থান ঠিক করে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট সুউচ্চ টাওয়ার সেট করতে হবে। এই টাওয়ার তৈরি হবে বিশেষ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ধাতু দিয়ে, হাই-টেকনোলজির কাজ করা থাকবে। যখন বজ্রপাতের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে, ঠিক ওই মুহূর্ত থেকে তড়িৎ শক্তি ট্রান্সমিশনের জন্য ব্যবহৃত হবে সুপার হাই-ফ্রিকোয়েন্সি মাইক্রোওয়েভ। চুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে টেনে নিয়ে তড়িৎ শক্তি ধারণ করে এর মাধ্যমে বিদ্যুতে পরিণত করা করবে।

আগের আমলে মানুষ কিন্তু বন-জঙ্গলে হিংস্র জীব-জন্তুর সাথে একত্রে বসবাস করতো। জীবজন্তুর হাত থেকে জীবন রক্ষার জন্য তারা তলোয়ার ও লাঠির মাথায় লোহার বল্লম সংযোগ করে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো। তখনকার আমলে মানুষের এতো জ্ঞান-বুদ্ধি ছিল না। এই লোহার পাত সংগ্রহ করা তাদের কাছে তখন দুর্লভ বস্তু ছিল। এ জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হতো, বিশেষ করে বর্ষাকালের জন্য। ওই সময় বৃষ্টির সঙ্গে এই বজ্রপাত যখন বিকট শব্দে ভূমিতে পতিত হতো, তখন তারা মনে করতো সৃষ্টিকর্তা তাদের জন্য কিছু একটা দিলেন।

বজ্রপাত ঠিক কোথায় পতিত হবে, সেই জায়গা শনাক্ত করার জন্য ফাঁকা মাঠে তারা ওঁৎ পেতে দেখতো। পরে সেই জায়গাটি চিহ্নিত করে রাখত। বৃষ্টি থেমে গেলে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বজ্রপাতের পতিত নির্দিষ্ট সেই জায়গার মাটি খনন শুরু করে দিত। এ রকম করে প্রায় ১০-১৫ ফিট মাটি খুঁড়তেই পেয়ে যেত প্রকৃতিপ্রদত্ত বজ্রপাতের চৌম্বক। এ দিয়ে তারা জীবন রক্ষাকারী তলোয়ার, বল্লম, তীর ও ধনুক তৈরি করতো।

মাটি থেকে যখন এ লোহা তোলা হতো তখন তা ১.৫ ইঞ্চি চওড়া/ ৪-৬ ফুট লম্বা কিংবা ২ ইঞ্চি চওড়া/৬-৮ ফুট লম্বা জমানো লোহার পাত আকারে পাওয়া যেত। এখনো এই ধারা চালু আছে, কিন্তু এখন মানুষ এ বুদ্ধি কাজে লাগায় না বা জানা নেই পদ্ধতি। শুধু খনিজ থেকে যে তরল চুম্বক লোহার বিদ্যুৎ আকারে মাটিতে পড়ে তার সাপটাই মানুষের শরীরে লাগলে মানুষ মারা যায়। কিন্তু মূল তরল লোহার বিদ্যুৎটা কিন্তু মাটির নিচে চলে যায়। যা লোহা কিংবা বিভিন্ন খনিজ সম্পদ হিসেবে আহরণ করে থাকি আমরা।

Comments

comments