যে ৫ কারণে আচমকা রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়লেন জিদান

স্পোর্টস ডেস্ক:
গত শনিবারই টানা তৃতীয় বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জিতেছে। রিয়াল মাদ্রিদের তাই এখন সময়টা উৎসবের। কিন্তু উৎসবের মধ্যেই বিদায়ের করুণ রাগিনী বাজিয়ে দিলেন কোচ জিনেদিন জিদান। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের হ্যাটট্রিক শিরোপায় দলকে অমরত্বের আসনে বসিয়ে বৃহস্পতিবার রিয়ালের কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন জিদান। কেন আচমকা এই পদত্যাগ?

স্পেনের গণমাধ্যমগুলো জিদানের এই হঠাৎ পদত্যাগের পেছনের সেই কারণগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। গবেষণা করে তারা উদঘাটন করেছে জিদান আসলে পদত্যাগ করেছেন মোট ৫টি কারণে। সেই ৫ কারণ কি কি, পরিবর্তন পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

১. মিশন পরিপূর্ণ
রিয়ালের পধান কোচ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আড়াই বছর। এই স্বল্প সময়েই তিনি ক্লাবকে উপহার দিয়েছেন ৯টি শিরোপা! যার মধ্যে ৩টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। টানা তিন বছরে তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, এতোদিন এটা ছিল অবিশ্বাস্য। নিজের কারিশমায় জিদান সেটাকেই করেছেন বাস্তব। ইতিহাসের প্রথম ক্লাব হিসেবে রিয়ালকে উপহার দিয়েছেন টানা তিন শিরোপা। শিরোপার হ্যাটট্রিক করে ক্লাবকে বসিয়েছেন অমরত্বের আসনে। আর কি চাই!

২. লিগ ও কাপ ব্যর্থতা
টানা তৃতীয় বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছে বটে। তবে স্পেনের ঘরোয়া ফুটবলে মৌসুমটা একদমই ভালো যায়নি জিদানের রিয়ালের। মৌসুমের অর্ধেক না যেতেই লিগ শিরোপা দৌড় থেকে ছিটকে পড়ে। কোপা ডেল রে’র কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেও ছিটকে পড়ে পুঁচকে লেগানেসের কাছে হেরে! মৌসুমের শুরুর দিকের ওই ব্যর্থতায় শুরু হয়ে যায় সমালোচনা।

বাইরের লোকেরা তো বটেই, রিয়ালের ঘরের মানুষদেরও কেউ কেউ জিদানের কোচিং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেন। ওই ক্লাব কর্তাদের আচরণ একদমই মেনে নিতে পারেননি জিদান।

৩. ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও গ্যারেথ বেলের অনিশ্চিত ভবিষ্যত
শনিবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের পরই রোনালদো ও বেল রিাল ছাড়ার ইঙ্গিত দেন। দুজনেই জানিয়ে দেন, রিয়ালে তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। তবে দুজনের কারণটা ভিন্ন। রোনালদোর কারণটা আর্থিক। আর বেলের ঘটনাটা বেশি বেশি ম্যাচ খেলা নিয়ে। বেল চান বেশি বেশি ম্যাচ খেলতে। সর্বোপুরি দলে চান তারকা মর্যাদা।

কিন্তু ফর্মহীনতার কারণে কোচ জিদান তাকে এই মৌসুমে বেশির ভাগ ম্যাচেই বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছেন। খেলিয়েছেন বদলি হিসেবে। কিন্তু বেল চান প্রতিটা ম্যাচেই তাকে শুরুর একাদশে খেলানো হোক। স্পেনের জনপ্রিয় ক্রীড়া দৈনিক এএস জানিয়েছে, ওয়েলস তারকার এই মনোভাবে প্রচণ্ড বিরক্ত জিদান।

৪. তার মতামত না নিয়েই সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের চুক্তি পরিকল্পনা
ক্লাব নতুন কোন খেলোয়াড় কিনবে, কাকে বিক্রি করবে, সেটা মূলত কোচদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতেই হয়। কিন্তু এবার রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ কোচ জিদানের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের ইচ্ছামত ট্রান্সফার পরিকল্পনা সাজান। ব্যাপারে মোটেই ভালো লাগেনি জিদানের। ভেতরে ভেতরে অসম্মানিত বোধ করেছেন।

দলবদল বিষয়ে এবার সেই আস্থা জিদানের প্রতি দেখাননি পেরেজ। বিশ্বমানের একজন গোলরক্ষক কেনার জন্য মরিয়া রিয়াল। জানুয়ারিতে অ্যাথলেতিক বিলবাওয়ের গোলরক্ষক কেপাকে কেনার দ্বারপ্রান্তেও পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু জিদান সভাপতি পেরেজের এই ইচ্ছার সঙ্গে একমত নন। বর্তমান এক নম্বর গোলরক্ষক কেইলর নাভাসের উপরই অগাধ আস্থা তার। জিদানে সরাসরিই বলেছেন, ‘নাভাসাই আমার গোলরক্ষক।’

৫. মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়া
খেলোয়াড়ী জীবনেই নিজের পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের প্রমাণ দিয়েছেন জিদান। ফরাসি মহানায়ক বুঝিয়ে দিয়েছেন, সারা দুনিয়া দিলেও তার ব্যক্তিত্বকে কেউ টলাতে পারবে না! কি নিয়ে মনোমালিন্যের কারণে যেন ২০০৬ সালে চুক্তি থাকার পরও খেলোয়াড়ী জীবনের ইতি টেনে দেন জিদান। সভাপতি পেরেজসহ রিয়ালের তৎকালীন কর্তারা শত বুঝিয়েও নিজের নেওয়া অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে জিদানতে টলাতে পারেননি।

সেই জিদান নিজের ব্যক্তিত্বের দাবিতে কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন, এ আর নতুন কি! তা রিয়ালের কোচের পদ যতই লোভনীয় হোক, জিদানের কাছে তার ব্যক্তিত্বই আগে। সম্মানই বড়। জিদান ভালো করেই জানেন, রিয়ালের কোচের চাকরিটা চিরস্থায়ী নয়। রিয়াল শুধু সাফল্যই চিনে। যতদিন সাফল্য পাবেন, ততদিনই দাম আছে। পান থেকে চুন খসলেই ছুঁড়ে ফেলবে রিয়াল। তা তিনি যত বিখ্যাত কোচই হোন।

জিদান এটাও জানেন, রিয়ালের এই অবিশ্বাস্য শিরোপা সাফল্যধারা বেশি দিন থাকবে না। সাফল্যের পথ একদিন হারাবেই। তখন ব্যর্থতার দায় নিয়ে মাতা নিচু করে বিদায় নিতে হবে। তার চেয়ে সময় থাকতে মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়াই ভালো। তাতে অন্তত নিজের ব্যক্তিত্ব থাকবে। তাই তিনি বিজয়ের মুকুট মাথায় নিয়েই সরে দাঁড়ালেন।

বিজয়ী বীরেরা তো মাথা উঁচু করেই বিদায় নেন!

Comments

comments