আমের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে আম চাষিরা

নাটোর প্রতিনিধি:
আমের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে নাটোরের আম চাষিরা। অনেক চাষি জানিয়েছে, তারা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না। বাগান মালিকরা ভালো জাতের আমের দাম ২০ টাকা কেজির বেশি না পেলেও লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। নাটোরের হাটে বাজারগুলোতে ১০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাগান মালিকরা বলছেন, আম বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ উঠছে না তাঁদের।

গত ২৫মে থেকে পাকা আম সংগ্রহ শুরু করেছে নাটোরের আমবাগান ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার আমের বাম্পার ফলন হলেও ভালো দাম না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। প্রথম অবস্থায় চাষিরা আমের ভালো দাম পেলেও ঈদের পর থেকে দাম কমতে শুরু করে।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার হাজারানাটোর এলাকার রবি খানের বাগান ঘুরে দেখা যায়, তাঁর বাগানে লোকজন আম পাড়ছেন। তিনি জানান, ২৪ বিঘা আয়তনের এই আমবাগানটি কুঁড়ি অবস্থায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন সাড়ে ৯ লাখ টাকায়। তাঁর বাগানে রয়েছে গোপালভোগ, কালুয়া, ক্ষীরশাপাতি, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, বারি আম-৪, ল্যাংড়া, ফজলি, লক্ষ্মণভোগ, মল্লিকা, আশ্বিনাসহ নানা জাতের আম। আমবাগান ক্রেতা মৌসুমি ব্যবসায়ী ফজল আলী জানান, এই বাগান পাহারা, কীটনাশক ও ভিটামিন ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচর্যায় ব্যয় করেছেন আরো কয়েক লাখ টাকা।

তিনি দুই দিন আগে নাটোর শহরের স্টেশন বাজারে লক্ষ্মণভোগ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া জাতের আম বিক্রির জন্য আড়তে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে লক্ষ্মণভোগ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মণ, ক্ষীরশাপাতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ এবং অন্যান্য জাতের আম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। এতে করে তাঁর ভ্যান ভাড়া, শ্রমিক খরচ বাদ দিয়ে যা থেকেছে তা দিয়ে খরচ উঠছে না। তিনি বলেন, তাই বাধ্য হয়ে বর্তমানে আম ফেনী, নোয়াখালী, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাকে করে আম পাঠাচ্ছেন। কিন্তু বাজারে আমের দাম না বাড়লে তাঁর ব্যবসার পুঁজি ঘরে উঠবে না।

লালপুর উপজেলার, লালপুর, গোপালপুর, ধুপইল, দুয়ারিয়া, কদমচিলান এবং বাগাতিপাড়া উপজেলার, মালঞ্চি, তামালতলা, জামনগর এবং পাকা ইউনিয়নের বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা যায়, বাগানগুলোতে গাছে গাছে সবুজ আম থোকায় থোকায় ঝুলছে। আমের ভারে গাছগুলো মাটিতে নুয়ে পড়েছে। বাগানে শেষ সময়ের পরিচর্যার কাজ শেষ। এখন চলছে আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের পালা। কিন্তু বাগানগুলোতে নেই ক্রেতার আগমন। তাই বাধ্য হয়েই ভ্যানে করে আম নিয়ে বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করছেন। কিন্তু সেখানেও পাচ্ছেন না আমের মূল্য।

লালপুর উপজেলার গোপালপুর আমবাগান মালিক সোহেল রানা বলেন, ‘আমার আড়াই বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের বাগান রয়েছে। বিগত দিনের তুলনায় এ বছর আমের ফলন আশানুরূপ ভালো হয়েছে। কিন্তু আমের দাম না পাওয়ায় লাভ করতে পারছেন না তিনি। আম চাষি শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘আমি ৯ বিঘা জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা জাতের আমের চাষ করেছি। এ বছর আমার বাগানে আমের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে আম বিক্রি হচ্ছে না। আগে বাগান ঘুরে ঘুরে ব্যাপারীরা আম কিনে ট্রাক ভরে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এখন কেউ আসছে না।

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার সূত্র জানায়, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে লালপুর, বাগাতিপাড়া এবং বড়াইগ্রাম এই তিনটি উপজেলায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে আম চাষ হয়ে থাকে। বাকি উপজেলাগুলোতেও কম বেশি বাগান রয়েছে। এই বছর আমের অন ইয়ার হওয়ার কারণে অন্য বছরের তুলনায় আমের উৎপাদন বেশি হবে। এই বছর প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে, যা থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া পরিপক্ব আম যাতে বাজারে আসতে পারে সে জন্য বিভিন্ন জাতের পাকা আম গাছ থেকে সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার উপপরিচালক মেফতাহুল বারী বলেন, আমের এবার অন ইয়ার। অন্য বছরের তুলনায় এবার আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, আমের দাম কমে যাওয়ায় প্রকৃত আম চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

Comments

comments