ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় যুগান্তকারী অর্জন, কার্যকর ‘ওষুধ’ আবিষ্কার

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক:
একটি বিশেষ ধারার ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে এর জীবাণু শরীরে থেকে যায় বছরের পর বছর। প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স নামের জীবাণুবাহী মশার কারণে ওই ধরনের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় মানুষ। নতুন করে মশা না কামড়ালেও ওই জীবাণু শরীরে থাকলে আবারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ম্যালেরিয়ার এই বারবার ফিরে আসা ঠেকানোর এক ওষুধ আবিষ্কার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে দেশের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) টাফেনোকুইন নামের ওই ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাফেনোকুইন যকৃতে থাকা জীবাণু প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্সকে ধ্বংস করতে সক্ষম। একে ‘যুগান্তকারী অর্জন’ আখ্যা দিয়েছেন তারা। এখন বিশ্বব্যাপী ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিজেদের মানুষের জন্য টাফেনোকুইনের অনুমোদন দেবে কিনা তা নিয়েই চিন্তা করছে।

সাব-সাহারান আফ্রিকায় ‘প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স’ জীবাণুবাহী ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। রোগটির জন্য বিশেষ করে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। একবার মশার কামড়ের কারণেই তারা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে আর অনেক সময় স্কুলে যেতে পারে না। শরীরে রোগের জীবাণু থেকে যাওয়ার মশার মাধ্যমে তা খুব সহজেই অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্ব থেকে এই রোগ নির্মূল করা কঠিন হচ্ছে। এই ধারার ম্যালেরিয়া রুখতেই যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) টাফেনোকুইনের অনুমোদন দিয়েছে। নতুন এই ওষুধটি মানবদেহের যকৃতে লুকিয়ে থাকা জীবাণুও ধ্বংস করবে। ফলে একবার আক্রান্ত হলেই ওই ব্যক্তির পুনরায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি থাকবে না। তাৎক্ষণিক সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য নতুন ওষুধটি অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশিও ব্যবহার করা যাবে।

যকৃতে ম্যালেরিয়ার লুকিয়ে থাকা জীবাণু থেকে মুক্তি পেতে প্রিমাকুইন নামে ওষুধের উপকরণ হিসেবে আগে থেকেই টাফেনোকুইন ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রিমাকুইন ওষুধটি ১৪ দিন ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু টাফেনোকুইনের মাত্র এক ডোজ ওষুধেই সেই কাজ হবে। প্রিমাকুইন ওষুধটি কয়েকদিন ব্যবহার করার পরই রোগীরা ভালো অনুভব করতে থাকেন। এই কারণে অনেকেই ১৪ দিনের পুরো কোর্স শেষ করেন না। তাই তারা ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেন না। বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে টাফেনোকুইন তাদের এই শঙ্কা দূর করেছে।

এফডিএ বলেছে, এই ওষুধটি কার্যকর ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহার করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবে সতর্কতার বিষয় হলো, এটার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যাদের হজমে সমস্যা আছে তাদের এই ওষুধটি নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, এতে মারাত্মক রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া অপুষ্টিতে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আর এই কারণে গরিব অঞ্চলগুলোতে ওষুধটি নিয়ে সমস্যা হতে পারে। আর এসব এলাকায়ই ম্যালেরিয়া খুব সাধারণ রোগ। এছাড়া ওষুধটি উচ্চমাত্রায় প্রয়োগ করা হলে রোগীদের মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে এসব সতর্কতা সত্ত্বেও নতুন ওষুধটি বিশ্ব থেকে ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার হার কমাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রিক প্রাইস বিবিসিকে বলেন, টাফেনোকুইনের মাত্র একটি ডোজেই যকৃতের জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি একটি বিস্ময়কর অর্জন। আমার মনে হয়, ম্যালেরিয়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে গত ৬০ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি জিএসকে ‘ক্রিনটাফেল’ নামে এই ওষুধটি উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রেসিডেন্ট ডা. হাল ব্যারোন বলেন, গত ৬০ বছরের মধ্যে প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার নতুন চিকিৎসা হিসেবে ক্রিনটাফেলের অনুমোদন এই ধরনের পুনরাবৃত্ত ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি বলেন, অংশীদাররাসহ আমরা বিশ্বাস করি, ক্রিনটাফেল ম্যালেরিয়া রোগীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হবে। এই রোগটি নির্মূলের চলমান প্রচেষ্টায় এটা অনেক অবদান রাখবে। ১৯৭০-এর দশকেই টাফেনোকুইন ছিল কিন্তু তা ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো না। জিএসকে এই ওষুধটি ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাব দেয়। এখন ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে এসব দেশে ওষুধটি ব্যবহারের অনুমতি আদায় করাই হবে কোম্পানিটির নতুন পদক্ষেপ।

সূত্র: বিবিসি।

Comments

comments