বরখাস্তের প্রতিবাদে বাকৃবি উপাচার্যকে বাসায় অবরুদ্ধ

মো. আরিফুল ইসলাম, বাকৃবি:
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভিসি, প্রো-ভিসির সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে দুই কর্মকর্তা- কর্মচারী সাময়িক বরখাস্তের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসহ সব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তালা দিয়ে সড়ক অবরোধ করে ভিসির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের সামনে সড়কে অবস্থান কর্মকর্তা- কর্মচারীরা। অবস্থানের কারনে ভিসির বাসভবনে ভিসিসহ শিক্ষক নেতারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এদিকে প্রশাসনিক ভবনসহ অন্যান্য দপ্তরে তালা দেয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কোনো অনুমতি ছাড়াই প্রায় ৩০-৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ভিসির কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিসির সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা কাটাকাটি ও গালিগালাজ করতে শুরু করেন। এ সময় প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. মো. জসিমউদ্দিন খান অফিসারদের সবাইকে হট্টগোল না করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কথা বলতে ও আলোচনায় বসার কথা বলেন। এতে তারা ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে এবং ভিসি, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), প্রক্টর, ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক, ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টার (ভারপ্রাপ্ত) সামনেই অফিসাররা প্রো-ভিসির দিকে তেড়ে যান এবং গালিগালাজ করতে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে হট্টগোল এবং ভিসি, প্রো-ভিসির সাথে অসৌজন্যমুলক আচরণের অভিযোগে গত বুধবার দুইজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও ছয় জনকে শোকজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সাময়িক বরখাস্তরা হলেন- শিক্ষা বিষয়ক শাখার কর্মচারী ও ৩য় শ্রেণির সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন ও কর্মকর্তা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক জিয়াউর রহমান টিটু।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল বাসার আমজাদ, ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান মো.খাইরুল আলম নান্নু, মো.আবদুল বাতেন, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ বিভাগের মোহাম্মদ মোস্তাইন কবীর সোহেল, সংস্থাপন শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আশিকুল আলম বাচ্চু ও খামার ব্যবস্থাপনা শাখার অ্যাডিশনাল রেজিস্ট্রার ড. মো. হেলাল উদ্দীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় প্রশাসন। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নোটিশে আগামী ৭ দিনের মধ্যে উপযুক্ত উত্তর দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ওই সাময়িক বরখাস্তের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরে ভিসির বাসভবনসহ প্রধান সড়ক অবরোধ করেন তারা। এদিকে প্রতিবাদে প্রশাসনিক ভবন, কোষাধ্যক্ষের কার্যালয় ও প্রকৌশল ভবনে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ সময় প্রশাসনিক ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। গুরুত্বপূর্ণ এসব দপ্তরে তালা দেওয়ার ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। আন্দোলনকারীরা ভিসি বাসভবন থেকে কোন শিক্ষককেও বের হতে দিচ্ছে না। আন্দোলনকারীরা বলছেন, বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারসহ সকল দাবী না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

বিগত কয়েকবছর থেকে আন্দোলনকারীরা চাকুরি স্থায়ীকরণ, বয়স বৃদ্ধিসহ বেশকিছু দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন। তারা অভিযোগ করেন, আগেও তাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য সময় নিয়েছিল প্রশাসন কিন্তু আশানুরুপ কোন ফলাফল পাননি তারা।

তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মাস্টাররোল এডহক কর্মচারী থাকার পরও সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবৈধভাবে বেশকিছু মৌসুমি শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছে। অথচ কেউ কেউ ২৫ থেকে ২৭ বছর ধরে মাস্টাররোল, এডহকে চাকুরি করছে। তাদের চাকুরি স্থায়ী করছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আন্দোলনকারী কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকুরিজীবীদের ইনক্রিমেন্টর কোন সুযোগ নেই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবৈধভাবে নানা ইনক্রিমেন্ট ভোগ করছেন। পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য শিক্ষকরা আলাদা সুবিধা পেলে পিএইচডিধারী কর্মকর্তারা কেন সুবিধা পাবেন না। তারা আরও বলেন, গত সোমবার এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতেই তারা ভিসির কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রো-ভিসির উষ্মাপূর্ণ কথায় কর্মকর্তাদের সাথে তার (প্রো-ভিসির) উচ্চবাক্য বিনিময় হয়। ঘটনাটি অনাকাঙিক্ষত ও অনভিপ্রেত।

অফিসার পরিষদের সভাপতি মো. আরীফ জাহাঙ্গীর ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আলমগীর বলেন, ভিসি কার্যালয়ের ওই অনাকাঙিক্ষত ঘটনার ফলে আমাদের দুইজন কর্মকর্তা কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত ও ছয়জনকে শোকজের প্রতিবাদে আমাদের আন্দোলন চলছে। আজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে তাদের বরখাস্তাদেশ ও শোকজের নোটিশ প্রত্যাহার এবং আমাদের যৌক্তিক দাবি মানা না হলে আগামী রবিবার থেকে ভিসি-প্রোভিসির পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চলবে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অচলাবস্থার বিষয়ে কয়েকজন সিনিয়র প্রফেসরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছেন বিশ্ববিদ্যায়ের সংবাদদাতা। সিনিয়র প্রফেসররা অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলতে বিব্রতবোধ করেছেন। অনেকেই আবার এ অবস্থার জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের কুফল বলে মনে করছেন। তারা বলেন, এ ধারা চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণার পরিবেশ বিনষ্ট হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কেরও অবনতি ঘটবে।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের সাথে আলোচনা চলছে। আলোচনা শেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Comments

comments