পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন

ড. কামরুল হাসান মামুন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আসছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। নতুন শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিতে থাকছে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা, ডামি ক্লাস এবং সবশেষে থাকছে ভাইভা। প্রশ্ন হলো শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসাবে কি থাকছে? প্রভাষক হতে নুন্যতম যোগ্যতা হিসাবে রয়েছে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৫০ এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ ৩.৫০ থাকার বাধ্যবাধকতা। এবার আসা যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএস/বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হতে ন্যূনতম যোগ্যতা কি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করার ন্যূনতম যোগ্যতা হলো এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৪.০০! অর্থাৎ যার এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৪.০০ আছে সেও ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলে অনেকেই যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫.০০ পেয়েছে তাদেকেও ছাড়িয়ে চান্স পেতে পারে এবং আমার শিক্ষকতা জীবনে এমন অনেক দেখেছি যাদের ৪.০০ এর বেশি কিন্তু ৪.৫ এর চেয়ে কম। গতকালও আমাকে একজন ইমেইল করেছে যার জিপিএ ৪.৫০ এর চেয়ে কম। সে শুধু চান্সই পায়নি সে ক্লাসের সেরাদের অন্যতম হয়ে অনার্স মাস্টার্স পাশ করেছে। এই ছাত্রের এখন প্রশ্ন: আমি কেন শিক্ষক হওয়ার জন্য দরখাস্তই করতে পারব না?

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির সাথে “বিশ্ব” শব্দটি যোগের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইউনিভার্সালিটি রূপ পেয়েছে। আমাকে এমন একটি দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলুনতো দেখি যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসি লেভেলের পরীক্ষার ফলাফল চায়? প্রাইমারি স্কুল কিংবা হাই স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসির রেজাল্ট চাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু ইউনিভার্সিটির শিক্ষক নিয়োগেও? আবার চাইবেনও যখন তখন এমন হাস্যকর চাওয়া কেন? একটি ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেইদিন ভর্তি হবে সেইদিন থেকেই সে যদি জানে সে যত ভালোই করুক সে যেন বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন না দেখে? কত অমানবিক? অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসিতে যেই কলংকের তিলক কপালে এঁটেছে সেটা সে আর জীবনেও খুচাতে পারবে না। অন্তত বাংলাদেশে না। আমাকে যেই ছাত্রটি ইমেইল করেছে সে যদি এখন আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য গিয়ে খুব ভালো পিএইচডি করে এবং পোস্ট-ডকও করে সে হয়ত পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন এমআইটি হার্ভার্ড কিংবা কেমব্রিজ অক্সফোর্ডের শিক্ষক হতে পারবে কিন্তু নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে কোন দিনও হতে পারবে না। এইবার বুঝুন এইটা কেমন বলদামি নিয়ম!

এছাড়া আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি কেমন হবে সেটা কি আমাদের লোকাল নিয়মে হতে হবে? আমাদেরকে কেন ব্যতিক্রমী নিয়ম করতে হবে। পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেইভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয় সেগুলোকে অনুরসন না করে আমরা কেন এত গবেষণা করে হাস্যকর নতুন নিয়ম তৈরী করছি? এইরকম লিখিত পরীক্ষা হলে কারা প্রশ্ন করবে? নিশ্চই প্রশাসনের আশপাশের শিক্ষকরাই করবে। তারা রাজনোতিকভাবে কতটা দলান্ধ সেটা দেশের আপামর জনসাধারণ জানে। এইরকম লিখিত পরীক্ষা হওয়া মানে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে প্রশ্ন ফাঁস করে ভালো প্রার্থীকে ডিঙিয়ে বেটার প্রমান করার মত কুকাম যে হবে এটা প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

আমাদের শিক্ষক নিয়োগের নিয়োগ বোর্ডের দিকে তাকালেই বোঝা যায় আমরা কেমন শিক্ষককে বোর্ডে নিয়োগ দেই। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন সরাসরি দল করা শিক্ষক ছাড়া নিয়োগ বোর্ডে কাউকে পাওয়া দুস্কর। তাছাড়া একটি নিয়োগ বোর্ডের যারা মেম্বার হন তাদের ক্ষমতা এবং পদবীর মধ্যেও নাই কোন সমন্বয়। সেখানে থাকেন ভিসি কিংবা প্রোভিসি, থাকেন একজন ডিন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান এবং বিষয়ের একজন এক্সপার্ট।

এখানে স্পষ্টতই একটি ক্ষমতার একটি হায়ারার্কি আছে। বিশেষ করে যেই বোর্ডে ভিসি বা প্রোভিসি থাকবে সেই বোর্ডের অন্যান্য সদস্যরা কেমন শক্ত ভূমিকা রাখতে পারবে তা সহজেই অনুমেয়। আরো আশ্চর্য বিষয় হলো এই বোর্ডে যারা থাকেন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের মধ্যে কমপক্ষে একজন এবং ক্ষেত্র বিশেষে সবাই সিন্ডিকেটে সদস্য যারা নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশকে বিবেচনা করে নিয়োগ চূড়ান্ত করেন। যারা সুপারিশ করলেন তারাই আবার তাদের সুপারিশকে ছুরাতন করবেন। মানে এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে? আমরা যদি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হতাম, আমরা যদি সত্যি সত্যি আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে চাইতাম তাহলে কি করে দলীয় বিবেচনায় এক্সপার্ট নিয়োগ দেই? কেন আমরা নিয়োগ বোর্ডের সদস্য নির্বাচন করতে নিশ্চিত করি না যে বোর্ডের সকল সদস্য মোটামোটি সমান পদবীর হয় এবং নিশ্চিত করি নিয়োগ বোর্ডে যেন এমন কেউ না থাকে যারা আবার সিন্ডিকেট সদস্যও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া চারটে খানিক কথা না। একজন শিক্ষক হয়ে গেলে সে কমপক্ষে ৩০-৩৫ ধরে পড়াবে। একটা খারাপ নিয়োগ মানে ৩০-৩৫ বছর যাবৎ যত ছাত্রছাত্রী আসবে তাদের সকলের ক্ষতি করা। শুধুই কি তাই? সে যেমন ছাত্র তৈরী করবে তারাও খারাপ হবে। ওই খারাপরা আরো খারাপ বানাবে। একটি খারাপ শিক্ষক ক্যাসকেডিং পদ্ধতিতে খারাপ বানাতেই থাকবে। এইজন্যই পৃথিবী জুড়ে শিক্ষক নিয়োগকে অনেকগুলো ধাপে বিভক্ত করা হয়েছে। আমাদের ইউজিসির proposed পদ্ধতিতেও দুইতিনটে ধাপের কথা বলা হয়েছে কিন্তু ধাপগুলো সাথে সারা পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ধাপের কোনোই মিল নেই। ধাপগুলো কি? ধাপগুলো বলার আগে বলতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কি? সারা পৃথিবীতে এটি পিএইচডি। ভারতেও অনেক বছর ধরে অলিখিতভাবে এটি মেনে চলেছে। কিন্তু এই বছর ওদের ইউজিসি একদম আইন করার সুপারিশ করেছে যে, ২০২১ সাল থেকে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা হলো পিএইচডি।

পশ্চিমা দেশের অধিকাংশ ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা হয় প্রার্থী স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারে কিনা। সেটা যাচাইয়ের জন্য পিএইচডির পর এক বা একাধিক পোস্ট-ডকের মাধ্যমে গবেষণায় কেমন সেটা দেখা হয়। আমাদের এখানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণা থেকে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমন হয়েছে একজন প্রার্থী পিএইচডি করেছে, পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতা আছে, ভালো গবেষণা রেকর্ড আছে, সাইটেশন সংখ্যা অনেক অধ্যাপক থেকেও বেশি আছে আর তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় হয় প্রভাষক হিসাবে। যেখানে একই নিয়োগ বোর্ড গতকাল যে কেবল মাস্টার্স পাশ করেছে সেও নিয়োগ পে প্রভাষক হিসাবে। এর চেয়ে অন্যায় অবিচার বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে আর কোথাও হতে পারে?

একটি সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ কিভাবে হয়? প্রথমে প্রার্থীকে দরখাস্ত করতে হয়। এই দরখাস্তের সাথে কি থাকে? ১. একাডেমিক সিভি, ২. রিসার্চ স্টেটমেন্ট ৩. তিনজন রেফারীর কাছ থেকে প্রার্থীর পক্ষে রেকমেন্ডেশন লেটার। এছাড়া নিয়োগ পেলে সে কিভাবে বিভাগ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে তার উপর একটি বিস্তারিত স্টেটমেন্ট। এইগুলো দেখার জন্য থাকে একটি সার্চ কিমিটি যার সদস্যরা সবাই একই মানের। অর্থাৎ কেউ কারো বস না। এখন থেকে একটি শর্টলিস্ট করে তাদের ডেকে একটি ভাইভা নেওয়া হয়। তারপর এখন থেকে একটি শর্টলিস্ট করে তাদের ডেকে ডামি ক্লাস নেওয়া হয়। সেখানে ছাত্রছাত্রীরাও মূল্যায়ন করবে। এরপর প্রয়োজনে আবার একটি ইন্টারভিউ নিয়ে finally টেম্পোরারিলি নিয়োগ দেওয়া হয়। আমেরিকাতে একজন শিক্ষকের পার্মানেন্ট পদ পেতে হলে অনেক ধাপ পার হতে হয়।

আমরা একটি কাজ করতে পারি। মাস্টার্স পাশধারীকে প্রভাষক পদে নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসাবে ধরতে পারি। কিন্তু পিএইচডির আগে পর্যন্ত তার পদ পার্মানেন্ট হবে না এইটা যোগ করতে পারি। এইটুকু প্রেসারে রাখলে শিক্ষকদের মান ভালো হতে ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া বর্তমানে যে অনেকেই পিএইচডি করতে যাওয়ার জন্য বেতনসহ শিক্ষা ছুটি পান সেটা অনেক ক্ষেত্রেই লোপাট হয়ে যায়। অনেকেই বিদেশে থেকে যান কিন্তু বেতন হিসাবে প্রাপ্ত টাকাটা আর ফেরত দেননা। এটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তি পাবে। তবে ভবিষ্যতে কোন এক সময় আমাদেরকেও পিএইচডি বিহীন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। প্রস্তাবিত কিংবা বর্তমান পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষার মান বাড়াতে কোন ভূমিকা রাখবে না।

সুত্র: ফেজবুক

Comments

comments