নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা

মতামত

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ তাদের দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও থেমে নেই। দলীয় এসব শিক্ষকরা শুধু নিজ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নয়, নিজ গ্রামের এলাকায় অথবা পছন্দের প্রার্থীর এলাকায় গিয়েও তারা নির্বাচনমূখী বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন, এমনকি নিজ হাতে লিফলেট বিতরণ করছেন। অনেকে আবার নিজ ছবির পাশে দলীয় মার্কা সেটে দিয়ে সেই মার্কায় ভরসা রাখতে বা ভোট চাইতে এবং রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলীয় এসব কর্মকান্ডের ক্রেডিট নিতে তাঁদের অনেকে আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ছবি, প্রার্থীর পাশে থাকার ছবি, লিফলেট বিতরনের ছবি পোষ্ট করছেন ফেজবুকে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমাদের শিক্ষক সমাজ উঠেপড়ে লেগেছেন স্ব-স্ব দলের প্রার্থীদের জেতাতে।

এ অবস্থায় কোনটি শিক্ষক ও কোনটি রাজনীতিবীদ ভোটের মাঠে তা পার্থক্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার দলীয় শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারী সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে পরিবহন সুবিধা অনায়াসে নিতে পারলেও অন্যদের পক্ষে হয়তবা সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচনের সময় শিক্ষক নেতারা এভাবে ব্যস্ত হলেও অনেক উপাচার্যকে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই দলীয় কার্যক্রম চালানোর পাশাপািশ বিভিন্ন সভা সমাবেশে দলের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যায়। যাই হোক, আমাদের শিক্ষক সমাজের এসব কর্মকান্ড বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সময় দেখা গেলেও বর্তমানে এ অবস্থা অনেক বেড়ে গেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

এদিকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্বঘোষিত রুটিন অনুযায়ী বিভিন্ন সেমিষ্টারের ফাইনাল পরীক্ষা ভোট প্রদানের একদিন আগেও থাকায় শিক্ষার্থীরা নির্বাচনের আমেজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকের হয়তবা বাসা দুরে হওয়ায় এবং রাস্তায় জ্যামের আশংকা থাকায় নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট প্রদান করতে না পরার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেখানে শিক্ষা, গবেষনা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা সেখানে শুধূ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার দাবানলে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, দলীয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী অনেকেই নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে ব্যস্ত।

একটি সময় ছিল বাহিরের রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র নেতাদের শরণাপন্ন হতেন। এখন তার উল্টো চিত্রটি দেখা যাচ্ছে। চিত্র পাল্টে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে বাহিরের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, কলুষিত হচ্ছে ক্যাম্পাসের আবাসিক পরিবেশ। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার পরিবেশ ও মান দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে তার অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। কি তার স্টাটাস, কি তার অবস্থান, কি তার ভুমিকা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ? একজন শিক্ষক যখন রাজনীতিবিদের মত আচরণ করে, নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে তখন শিক্ষক হিসেবে যেমন তার মর্যাদাটুকু থাকে না তেমনি ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় পারস্পারিক আস্থার জায়গাটুকু, অভিভাবকত্ব হারিয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে যায়, নিয়ন্ত্রন হারিয়ে নষ্ট হয়ে যায় শিক্ষার পরিবেশ। একটি শিক্ষক যখন দলের অন্যায় ও অপকর্মকে অন্ধবিশ্বাসে সাপোর্ট করে, অন্যায়কে ছাপিয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয় তখন শিক্ষক হিসেবে তার আদর্শের জায়গাটুকু বিলীন হয়ে যায়। মোটকথা শিক্ষক যখন রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় তখন এসব অবস্থা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কনসেপ্ট অনুযায়ী এমন একটি জায়গা যেখানে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি আদর্শ, সংষ্কৃতি, অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদের শিক্ষা অর্জন করা যায়। ধারণ করে সাম্যতা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার পরিবেশ। একসময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধূ জ্ঞান চর্চায় নয়, দেশ ও জাতির চরম সংকটে দলমত নির্বিশেষে বড় ভুমিকা রাখতে দেখা গেছে। নৈতিকার জায়গায় দাড়িয়ে শিক্ষকদেরকে বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করতে দেখা গেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যে অবস্থা বিরাজমান তাতে দেশের সংকটময় সময়গুলোতে তাদের সঠিক ভুমিকা থেকে দেশ ও জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এহেন অবস্থার পিছনের শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাই দায়ী নয়, সরকার ও রাষ্ট্রের দায় অবশ্যই আছে। রাজনৈতিক সরকারগুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেভাবে দলীয় কাজে ব্যবহার করে তাতে দিন দিন এসব অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বাহিরের দেশগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আলাদা নির্বাচন আচরন বিধি থাকে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের ক্যাম্পেইন বা নির্বাচনমূখী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব নীতমালা থাকে। অলাভজনক ও করমুক্ত পাবলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রার্থীরা পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে আচরনবিধি মেনে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিন প্রচারণার সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনই কোন একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কাজ করতে পারে না। বৈধ সকল দলের প্রার্থীদের সমান সুযোগ দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় বিধি ও রাষ্টীয় আইন মোতাবেক কোন ব্যতয় হলে বা কোন নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করলে বা পক্ষপাত্বিত করলে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে শাস্তি পেতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যান্তরে কোন রাজনৈতিক দলের চাঁদা সংগ্রহ বা ফান্ড গঠনের কার্যক্রম সম্পূর্ন নিষিদ্ধ এবং আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। পোষ্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, ফিল্ম বা কোন ধরনের রাজনৈতিক প্রদর্শনী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় রিসোর্চ বা সম্পদ ব্যবহার করে অথবা এফিলিয়েশন, লগো বা সিল ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চাকুরির আচরনবিধির পরিপন্থি।

নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা মিডিয়ার উপস্থিতিতে পেশা বা বিষয়ভিত্তিক গঠনমূলক আলোচনা-পর্যালোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারতাম। এসব অনুষ্ঠান হতে পারত ”কৃষি ও কৃষকের টেকসই উন্নয়নে” বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা, বিষয়ভিত্তিক নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা ইত্যাদি। সম্ভব হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বা উপযুক্ত প্রতিনিধিদের উপন্থিতিকে এসব আলোচনা বৈঠক হতে পারত। এভাবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক যেসব বিভাগ বা অনুষদ বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব বিভাগ, অনুষদ বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গঠনমূলক এসব আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে চিহ্নিত হত বিষয় বা ক্ষেত্র ভিত্তিক সমস্যা, বেরিয়ে আসত অনেক টেকসই পরিকল্পনা যা দেশবাসী জানত এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে উপলব্ধি আসতে পারত। এছাড়া সম্ভব হলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাবলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আগ্রহী সকল বৈধ প্রার্থীদের সাবলিল ও সামজ্ঞস্যপূর্ন বক্তব্য প্রদানের ব্যবস্থা করা যেত, শোনা যেত শিক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার কথা। আত্মসম্মান ও পেশার মর্যাদা বজায় রেখে, চাকুরির বিধি বিধান মেনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও প্রচারনা করা যেতে পারে।

শিক্ষকতা অন্য কোন পেশার মত নয় তাই বিষয়গুলো অবশ্যই ভাবতে হবে। একজন শিক্ষক যে কোন বাজনৈতিক আদর্শ ধারন করতে পারে কিন্তু পেশাগত কারণে সেটির প্রভাব শিক্ষার পরিবেশে ফেলানো কোনভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষা না দিয়ে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক, সামাজিক ও চারিত্রিক শিক্ষা দিয়ে তাদেরকে সুশিক্ষিত তৈরি করে দিলে তা দেশ ও জাতি গঠনে অনন্য অবদান হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো, টাফটস্ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ইমেইল: szaman@bau.edu.bd

Comments

comments