শিক্ষায় বর্তমান চ্যালেঞ্জ

মতামত

প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন

আমাদের জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ ও বিজ্ঞান ভিত্তিক মেধা সৃষ্টি এবং মানুষ তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আমরা কি জানি দেশে কত প্রকার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে? সব শিক্ষা ব্যবস্থা সমন্বয় করে এক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারি প্রাইমারি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পুর্ন ভেংগে পরেছে, কার্যকর ভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। এই সব স্কুলে কোন ভাল শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না। কারন লেখাপড়ার মান সর্বনিম্ন। জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে।  প্রচলিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। পরীক্ষা কখনও মেধা সৃষ্টি করে না বরং ভীতি সৃষ্টি করে তাই পিএসসি সহ অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষাসমুহ বাতিল করতে হবে। শিক্ষার সকল পর্যায়ে (১ম শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত) অপ্রয়োজনীয় কোর্স বাতিল করতে হবে। বই ও সেলেবাসের চাপ কমিয়ে বাস্তব সম্মত প্রায়োগিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গণমুখী বিজ্ঞান সম্মত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অবিলম্বে চালু করতে হবে। প্রতি বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে শিক্ষার্থীসহ প্রায় এক কোটি লোকের চরম ভুগান্তির পথ বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তির জন্য যুগপোযুগী আইন তৈরি করতে হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকল নৈরাজ্য চাঁদাবাজি অবৈধ ও অসামাজিক কাজকর্ম মাদকের প্রাদুর্ভাব তাৎক্ষনিকভাবে বন্ধ করার আইনগত ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সরকারের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকরী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে কারণ এটি সম্পুর্নভাবে বন্ধ করতে না পারলে ডিগ্রির গ্রহণ যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অলিতে গলিতে পাড়া মহল্লায় গজিয়ে উঠা কোচিং সেন্টার কার্যকর ভাবে বন্ধ করতে হবে। এই কোচিং সেন্টার গুলো কোমলমতি শিশুদের মেধা ও নিজের সক্ষমতা ধ্বংস করছে। ক্যান্সারের মত শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিরা উপশিরায় কোচিং সেন্টারের ভয়াংকর লার্ভা সংক্রমিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একই ভাবে আনাচে কানাচে বাসায় মিল কারখানায় গড়ে উঠছে নামে বেনামে নিয়ন্ত্রনহীন অগুনিত প্রাইভেট স্কুল, মাদ্রাসা, কিন্টার গার্ডেন। বাছবিচার না করে তারা যা খুশি তাই পড়াচ্ছে। কোর্স কারিকুলা ও সেলিবাসের কোন বালাই নেই। আইন করে এগুলো নিয়ন্ত্রন এবং প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে হবে। সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মেধা সৃষ্টির শিক্ষার পরিবেশ নিম্নগামী এবং বিপর্যস্ত অবস্থায় উপনিত হবার উপক্রম হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রসাশনিক দুর্বলতাই প্রধান কারন। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর, ট্রেজারার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষাবিদ ও তাঁর দক্ষতা, সক্ষমতা ও সমাজে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করে নিয়োগ দিতে হবে। ঐ সকল পদে বাছাই এর ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ক্রাইটেরিয়া নির্ধারনকরা যেতে পারে। প্রশাসক নিয়োগে অবৈধ ও অস্বচ্ছ পথ অবশ্যই সম্পুর্নভাবে বন্ধ করতে হবে। ভিসি নিয়োগের বিষয়টি সকল প্রভাবমুক্ত করতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষককে ভিসি নিয়োগ করতে পারলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।  সমস্ত কোর্স কারিকুলা ঢেলে সাজাতে হবে। প্রায়োগিক বিজ্ঞান ভিত্তিক ডিজিটাল সিস্টেম চালু করতে হবে। মেধা তৈরি, সমাজ উন্নয়ন, শিল্প কারখানার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার যোগ্য গ্রাজুয়েট তৈরিতে সহায়ক এবং বিশ্বায়নের সাথে সামঞ্জস্য-সংগতিপূর্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মহান স্বাধীনতার ৪৭ বৎসর অতিবাহিত হলেও কার্যকর কোন শিক্ষানীতি প্রবর্তন করা সম্ভব হয় নি। যুগের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষায় পারদর্শী মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশ বিনির্মান করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। স্বাধীনতার অব্যাহতি পরই জাতির জনক সম্যক উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এবং সে মোতাবেক তিনি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। শিক্ষানীতি চালুর প্রাক্কালেই জাতির জনককে সপরিবারে মর্মান্তিক ও নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকি মডেল চালু করা হয়েছিল। সে থেকে শিক্ষায় আমুল কোন পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। মানসম্মত শিক্ষাই সকল পর্যায়ে সমন্বিত উন্নয়নের বড় চ্যালেজ্ঞ। কাজেই কাল বিলম্ব না করে বিজ্ঞান ভিত্তিক ডিজিটাল প্রায়োগিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

দেশে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যাদের অধিকাংশই বানিজ্যিক কারখানা হিসাবে পরিচালিত হচ্ছে। স্থান ও পরিবেশবিহীন এই সব অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সার্টিফিকেট বিক্রির কারখানা হিসাবে পরিনত হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে মেধাকে পদদলিত করে সার্টিফিকেট বিতরনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পূর্বে যেগুলো বর্তমানে চালু আছে তার সামগ্রিক উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে পরেছে। সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে একই বা সমার্থক কোর্স কারিকুলার আওতায় আনা যেতে পারে।  সকল ডিগ্রিকে কার্যকর ভাবে প্রায়োগিক ও ডিজিটাল কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ জরুরী ভাবে গ্রহণ করতে হবে।  প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মান নিয়ন্ত্রনের জন্য পৃথক একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করে কার্যকর ভাবে মনিটরিং করার প্রয়োজন আছে। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপযুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করে স্বচ্ছতার সাথে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত অপরিহার্য। কারণ মানসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষকের উপরই নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদন্ড, মূল্যায়িত হল বিশ্ববিদ্যালয়।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান হাজারো সমস্যার মধ্যে উপরুক্ত বিষয়গুলির প্রতি জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় নতুন শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক: প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ও প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

comments