বৃত্তি নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা

মতামত

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতে কে না চায়। আর সেটি যদি হয় ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় তাহলে তো কথায় নেই। কেউবা নিজ খরচে, কেউবা বৃত্তি নিয়ে ভ্রমন করছেন স্বপ্নের এই দেশগুলো। তবে বৃত্তি নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করলে নিজেকে অনেকটাই গর্বিত ও সার্থক মনে হয়। অনেকের এরকম স্বপ্ন থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ করাটা চ্যালেঞ্জ ও কৌশলের। হয়তবা ইতিমধ্যে অনেকেই স্বপ্নপূরণের এ রাস্তায় নেমে হতাশ হয়ে পিছু হটিয়েছেন, কেউবা চেষ্টার পর চেষ্টা করে যাচ্ছেন আবার কেউবা হঠাৎ করে পেয়েও যাচ্ছেন। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শোনা যায় প্রফেসর পাওয়া যায় না, ইমেইল করলেও উত্তর পাওয়া যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার কিভাবে কি করতে হয় বা কিভাবে এগুতে হয় এই ভয়েই অনেকের হয়তবা শুরুটাই করা হয় না। অনেকেই আবার রেজাল্ট ভাল না থাকায় চেষ্টাও করেন না, তবে এ ধারণা একেবারেই ভুল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নূন্যতম বি-গ্রেড নিয়েও বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাওয়া যায়। এমনকি ওঊখঞঝ বা ঞঙঋঊখ ছাড়াও অনেক দেশে বৃত্তিসহ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রয়োজন কিছু সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন বা আর্টিকেল। তবে তা আন্তর্জাতিক জার্নালে থাকতে হবে এমনটি নয়, দেশীয় জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেল দিয়েই বৃত্তি সহ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাওয়া সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৪৩ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছেন। এদের প্রায় ৫৩ শতাংশ এশিয়া থেকে যাচ্ছে। গত দশকের শুরুতে বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২১ লাখ এবং চলতি দশকের শেষে ৮০ লাখে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে পাড়ি জমানোর দিক দিয়ে চীন শীর্ষে রেেয়ছে (৩১.৫%), এর পরেই ভারতের অবস্থান (১৫.৯%)।
জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে দেশে বাড়ছে গ্রাজুয়েটদের সংখ্যা কিন্তু সেই হারে বাড়ছে না চাকরির সুযোগ। অনেক শিক্ষার্থী তাদের যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না । হতাশা কাজ করছে এসব শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাঝে। দিশেহারা হয়ে পড়ছে আমাদের এই শিক্ষিত তরুণরা। উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে যেতে পারলে হয়তবা তাদের হতাশা কেটে যাবে, ফিরে আসবে স্বস্থি। নিজের যোগ্যতা ও মেধাকে প্রমাণ করে অর্জন করবে উচ্চশিক্ষা, তারপর ভাল একটি চাকরি। এসব আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই এখন সময়ের দাবী।

একজন শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক যিনি ইতিমধ্যে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। শিক্ষকতায় যোগ দেয়ার পর যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য মনস্থির করলাম তখন কিভাবে শুরু করব তা বুঝতে পারছিলাম না। সবাই শুধু বলতেন বেশী বেশী করে ইমেইল করতে, তাহলে একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু কিভাবে ইমেইল করতে হয়, কোথায় প্রফেসরের ঠিকানা বা ইমেইল পাওয়া যায় তা শিখিয়ে দেয়ার সময় অনেকেরই হত না।? ফলে নিজে নিজে শিখতে কিছুটা সময় লেগে গেছে। তবে শিক্ষকদের সহযোগিতা ছাড়া কাজটি খুবই কঠিন। কারণ বিদেশী প্রফেসর ম্যানেজ, গবেষণাপত্র তৈরি, সুপারিশ পত্র প্রদান, গবেষনা প্রবন্ধ প্রকাশ প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

কোন কাজই মানুষের অসাধ্য নয়, চেষ্টা অব্যাহত রাখলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাওয়া সম্ভব। সম্ভব যে কোন ধরণের গবেষণায় সফলতা অর্জন করা। বিদেশে উচ্চশিক্ষার সন্ধানে নিজ ডিগ্রী বা ডিসিপ্লিন এর সাথে সংগতি রেখে যেকোন বিষয়ের উপর কাজ করার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে হব্।ে এসব বিষয়কে লক্ষ করে আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোর অনলাইন সংস্করণ থেকে প্রফেসরের ইমেইল খুজে প্রতিনিয়ত লিখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক বা সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা নিতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রদানকৃত বৃত্তির জন্য অন্যান্য দেশের মত আমাদেরও আবেদনের সুযোগ থাকে। তবে সেগুলো অনেক প্রতিযোগীতামূলক এবং সংখ্যায় কম। আবার কিছু কিছু স্কলারশীপের বিজ্ঞপ্তি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় বা ইউজিসি কতৃক প্রচার অনেক সময় ডেডলাইন এর শেষ মূহুর্তে পাওয়া যায় ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আবেদন করার সুযোগ পায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব বিজ্ঞপ্তি প্রচারিত হয় না বলেও শোনা যায়। তাছাড়া দেশীয় অনুদান দিয়ে যেসব বৃত্তি প্রদান করা হয় তার বেশীরভাগই উপভোগ করেন বিশেষ শ্রেনীর মানুষেরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ সুযোগ নেই বললেই চলে। যদিও নিজ চেষ্টায় অনেকে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন তবে এ সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় নিতান্তই কম। উপরন্তু কিছু কিছু সুযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে আমাদের অনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও দূর্নীতির জন্য। আবার কিছু নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যা নিতান্তই প্রতিযোগীতামূলক। তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গতানুগতিক সীমিত সুযোগের পাশাপাশি উন্নতদেশগুলোর সাথে বিশেষ প্রোগ্রাম চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। যেমনটি করছে চীন, ভারত ও পাকিস্থান। নিজ ছাত্রদেরকে বাহিরে পাঠানোর বিষয়ে শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃত্তি প্রদানকারী সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হতে হবে যাতে তাদের প্রদত্ত বৃত্তি দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও অধিদপ্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও উন্নত কর্মপরিকল্পনা। কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে এগুতে হবে। সরকারের পরিকল্পনার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃত্তি প্রদানকারী সংস্থার সাথে আমাদের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। এছাড়া বিদেশে অবস্থানরত আমাদের মেধাবীদের দেশে সুযোগ দিয়ে তাদের অর্জিত উন্নত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে পারি।

পাকিস্থানে যে কোন শিক্ষার্থী বাহিরে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেলে সরকার থেকে যাওয়া-আসার টিকেট সরবরাহ করা হয়। তরুন প্রজন্মকে উন্নতবিশ্বে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে তারা এ কাজটি করে থাকে কারন তারা রিমিটেন্স সহ দেশের শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান বাখবে, অর্জিত জ্ঞানকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবে। আমাদেরকেও এভাবে ভাবতে হবে।

উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। উদাহারণস্বরুপ- কোন কোন দেশে উচ্চশিক্ষার আবেদন করতে সকল সার্টিফিকেট বা সনদ ফরেইন মিনিষ্ট্রি থেকে বাধ্যতামুলক সত্যায়িত করাতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল আমাদের ফরেইন মিনিষ্টিতে যদি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেকোর্ডের কোন দলিল প্রমানাদি না থাকে তাহলে শূধু রঙ্গিন কাগজ দেখে ফটোকপিতে সত্যায়িত করার নিয়ম অযৌক্তিক। কোন দেশ বা দুতাবাস যদি এই অযৌক্তিক নিয়ম বা শর্ত আরোপ করে তা যুক্তি দিয়ে সহজ করার দায়িত্ব আমাদের।

বিশ্বের অনেক দেশে নামি-দামী প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী বা ব্যাক্তি স্কলারশীপ ও গবেষণা অনুদান দিয়ে থাকে, আমারাও এ কালচার গড়ে তুলতে পারি। বিল গেটস্, টয়োটা, নিপ্পন ফাউন্ডেশন, আগা খান ফাউন্ডেশন এর মত অনেক বেসরকারি বা চেরিট্যাবল ফাউন্ডেশন, কর্পোরেশন বা সিভিল সোসাইট এগিয়ে আসতে পারে। দেশের অনেক কোম্পানি যারা সচারচর বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বড় ধরনের অনুদান দিয়ে থাকে তাদের সহযোগিতায় ও সংশ্লিষ্টাতায় ফান্ড গঠন করেও বৃত্তি প্রদান করার যেতে পারে। আমাদের এসব প্রতিষ্ঠান, বৃত্তবান গোষ্ঠী বা পরিবার যদি এদিকে দৃষ্টি দেয় তাহলে অনেক মেধাবী তরুন উপকৃত হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে তারা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে পারবে।

 

লেখকঃ ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো, টাফটস্ ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
ইমেইলঃ szaman@bau.edu.bd

Comments

comments