বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং পেতে বাধা অতিক্রম প্রয়োজন

ড. এম এল আর সরকার

প্রতিবছর কয়েকটি সংস্থা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং বা ক্রমতালিকা প্রকাশ করে। বিশ্বের বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ তালিকায় স্থান পায় এবং সঙ্গত কারণেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম তালিকায় থাকে না। আমরা হুজুগে বাঙালি।

প্রতিবছর কয়েকটি সংস্থা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং বা ক্রমতালিকা প্রকাশ করে। বিশ্বের বড় নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ তালিকায় স্থান পায় এবং সঙ্গত কারণেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম তালিকায় থাকে না। আমরা হুজুগে বাঙালি।

নিজেদের কিছু থাক বা না থাক, মানসম্মানের বিষয়ে খুবই সচেতন। ফলে যখনই এ র‌্যাংকিং প্রকাশিত হয়, তখনই আমরা শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মুণ্ডুপাত। বেশ কিছুদিন চলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষকদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক লেখালেখি। মনে হয় বিষয়টি এমন যে, দেশের সব সম্পদ ব্যয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু একটি র‌্যাংকিং, তা-ও নিতে পারছে না। আফসোস, শিক্ষকরা শুধু বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছেন! তবে কিছুদিন পর সব থেমে যায়। আবার এক বছর অপেক্ষা। আবার লেখালেখি। কিন্তু ফল শূন্য।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমতালিকায় নেই। কেন নেই, তার কিছু কারণ ইতিমধ্যে অনেকেই যেমন- প্রফেসর ড. জাফর ইকবাল স্যার (যুগান্তর, ২৪ মে ২০১৯) এবং ড. রাগিব হাসান সাহেব (প্রথম আলো, ২৬ মে ২০১৯) সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু যারা এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের কাছে আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, বলুন তো কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম এ ক্রমতালিকায় থাকতে হবে? আমাদের আসলেই কি কোনো কিছু বিশ্বমানের আছে? দেশের অন্য কোনো সংস্থার নাম কি বিশ্বমানের কোনো তালিকায় আছে? বরং এত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পরও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, নিরাপত্তাসেবাদানকারী সংস্থাগুলোর নাম দিন দিন দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাষ্ট্রের একটি অংশ। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনও অনেক মেধাবী শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী আছে। এ শিক্ষকরা নিজ গুণে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় (উচ্চ র‌্যাংকপ্রাপ্ত) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা নিজ দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাই হয়তো অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকরা চেষ্টা করলেই এটি সম্ভব। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বে র‌্যাংকিং পাওয়ার যে প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে আমাদের এ গুটিকয়েক মেধাবী শিক্ষকের পক্ষে তেমন কিছুই করা সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে র‌্যাংকিংয়ে আসতে পারে এ ব্যাপারে ড. রাগিব লিখেছেন। হ্যাঁ, এরকম কিছু করলে দেশের দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো ক্রমতালিকার ১০০০তম পর্যায়ে আসতে পারে। তবে আগামী ১০০ বছরেও আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০০-এর ভেতর আসবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আসবে না? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং পাওয়ার পথে বাধা অনেক। তন্মধ্যে দলীয় রাজনীতি, গবেষণা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ এবং সরকারের ভ্রান্ত কর্মসংস্থান নীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলোর আশানুরূপ আশু পরিবর্তন না হলে র‌্যাংকিংয়ের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির পক্ষে এবং বিপক্ষে সবসময় কিছু শিক্ষক দলাদলিতে ব্যস্ত থাকেন। ভিসিদের প্রধান কাজ হচ্ছে নিজের গদি ঠিক রাখা; নিয়োগ, প্রমোশন ও টেন্ডার বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করা, কিছু ফাইল আটকে রাখা, প্রভাবশালী ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং বিভিন্ন ফোরামে জাতি উদ্ধারে লম্বা বক্তব্য প্রদান করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য চিন্তা করার কোনো সময় তার থাকে না বা নেই। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভিসিরা বেষ্টিত-অবরুদ্ধ থাকেন কিছু দলকানা শিক্ষক দ্বারা। এদের ধ্যানজ্ঞানই হচ্ছে নীতিহীন রাজনীতির মাধ্যমে কিছু পাওয়া। শিক্ষকতা ও গবেষণা তাদের কাছে তুচ্ছ বিষয়। কোথায় নেই এ শ্রেণী? প্রশাসনিক পদে, নিয়োগ কমিটিতে, বিশেষজ্ঞ কমিটিতে- সব জায়গায় এ দলকানাদের জয়জয়কার!

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্য বা মেধাবী শিক্ষকরা অবহেলিত-উপেক্ষিত। এ দলীয়করণের মাত্রা যে কতটা ভয়াবহ, তা বর্ণনার জন্য আমার নিজের ঘটনাই তুলে ধরলাম। আমি দুটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয় (র‌্যাংক ২০০-এর নিচে) থেকে এমএসসি এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪ বছর শিক্ষকতা করেছি। আমার গবেষণা প্রথম সারির কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু আমার নাম বিভাগের বিশেষজ্ঞ প্যানেলে নেই। আমার কিছু সিনিয়র এবং জুনিয়রের (আমার ছাত্র) নাম বিশেষজ্ঞ প্যানেলে আছে। কেন আমার নাম নেই? আমি কি সত্যিই অযোগ্য? আমি কি সরকারবিরোধী? আমি কি রাজাকার? আমার বাবা কি রাজাকার ছিল? না, এসব কিছুই না। আমার নাম নেই, কারণ সাদা-হলুদ কোনো তালিকাতেই আমার নাম নেই। আমার নাম আছে সাধারণ শিক্ষকের তালিকায়। আমার মতো অনেক শিক্ষকই আছেন এ সাধারণ তালিকায়। তাদের মতামত বা অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই।

এ বিষাক্ত পরিবেশের মাঝেও অনেক শিক্ষক আছেন যারা গবেষণা করেন এবং করান। কিন্তু নানারূপ প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসান। তারপরও কিছু শিক্ষক নিজ গুণেই গবেষণা চালিয়ে যান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইচ্ছা থাকলেও ভালো ছাত্রছাত্রীরা এসব শিক্ষকের সঙ্গে কাজ করতে চায় না। কারণ কী? খুবই পরিষ্কার। এ শিক্ষকদের কোনো ক্ষমতা নেই, তারা নিয়োগ কমিটিতে নেই এবং তাদের সঙ্গে কাজ করলে অখুশি হবে ক্ষমতাসীনরা। ফল, শিক্ষক নামের রাজনীতিবিদের তত্ত্বাবধানে অন্তঃসারশূন্য গবেষণা এবং ভবিষ্যতে আর একজন রাজনীতিবিদ নিয়োগ। সরকারও এটিই চায়। সরকারের প্রয়োজন মেরুদণ্ডহীন একদল শিক্ষক। যারা সরকারের কথায় উঠবে, বসবে এবং নাচবে। বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং পেল বা না পেল, এতে সরকারের কিছুই আসে যায় না। বরং র‌্যাংকিং না পেলেই ভালো। সরকার বলতে পারবে এ অপদার্থদের অর্থ দিয়ে লাভ কী?

রাজনীতি ছাড়া আরেকটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে গবেষণা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রধানত শিক্ষা (৩০ শতাংশ), গবেষণা (৩০ শতাংশ), প্রকাশিত গবেষণার সাইটেশন (৩০ শতাংশ), আন্তর্জাতিক উপস্থিতি (৭.৫ শতাংশ) এবং গবেষণাকর্মের বাণিজ্যিকীকরণের (২.৫ শতাংশ) ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। তন্মধ্যে শেষোক্ত চারটি (৭০ শতাংশ) মূলত গবেষণার ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা ফল ভালো হলে সেটি জার্নালে প্রকাশিত হয়, সেই প্রকাশনার সাইটেশন হয় এবং ফল বাণিজ্যিকীকরণ করা যায়। ভালো গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্ববিদ্যালয় তথা গবেষকের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ের ৭০ শতাংশ স্কোর নির্ভর করে গবেষণার ওপর। আর গবেষণা নির্ভর করে গবেষণা বরাদ্দ এবং ভালো গবেষকের ওপর।

আমরা শুধু জানি, আমাদের দেশে গবেষণায় বরাদ্দ কম। কিন্তু কী পরিমাণ কম, তা জানি না। বিষয়টি বোধগম্য করার জন্য আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে (Dept of Land Surveying and Geo-Informatics, Hong Kong Polytechnic University) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুমানিক গবেষণা বরাদ্দ তুলে ধরলাম। Hong Kong Polytechnic University-এর বর্তমান র‌্যাংকিং হচ্ছে ১৫৯। Dept of Land Surveying and Geo-Informatics বিভাগের ওয়েব পেজ (http://www.lsgi.polyu.edu.hk/people/academic/index.asp) থেকে জানা যায়, এ বিভাগে বর্তমানে পোস্ট-ডক্টরেট ফেলো এবং গবেষণা সহযোগী আছেন ১৪ জন, যাদের মাসিক বেতন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পিএইচডি গবেষক আছেন ৫২ জন, যাদের মাসিক স্কলারশিপ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এমফিল এবং গবেষণা সহকারী আছেন ২১ (২+১৯) জন, যাদের মাসিক স্কলারশিপ/বেতন হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। গবেষকদের জন্য আছে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বরাদ্দ।

শুধু গবেষকদের বেতন ও স্কলারশিপ বাবদ বিভাগটির বছরে খরচ হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১টি বিভাগে এ খাতে বছরে আনুমানিক খরচ হয় প্রায় ৫৫৩ কোটি টাকা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ল্যাবের আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রতিবছর কী পরিমাণ খরচ হয়, তা আমাদের কল্পনার অতীত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর পক্ষে ১৮ কোটি টাকা তো দূরের কথা, এর একশ ভাগের একভাগ টাকাও স্কলারশিপ হিসেবে প্রদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ বছর ৪৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগে ১.৫ কোটি টাকাও নেই।

পাঠক, আপনাদের জ্ঞাতার্থে আমি সরকারের এ গবেষণা বরাদ্দ শুধু অন্য একটি খাতের বরাদ্দের সঙ্গে তুলনা করছি। ধরুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা, যেখানে বিভাগ আছে ৫৮টি। এ বিশ্ববিদ্যালয় বড়। তাই ধরে নিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভাগে পাবে ২ কোটি টাকা। প্রত্যেক বিভাগ পাবে প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আপনারা এবং সরকারের যারা বলেন, শিক্ষা খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি, তাদের কাছে জিজ্ঞাসা- আপনারা কি জানেন সরকারের হাজার হাজার প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শুধু গাড়িসেবা নগদায়ন বাবদ প্রত্যেকে বছরে পান ৬ লাখ টাকা? যদি জানেন, তাহলে কী করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের জন্য গবেষণা বরাদ্দ রেখেছেন মাত্র ৩.৩৪ লাখ টাকা? সত্যিই কী আশ্চর্য এদেশ! এদেশে একজন সরকারি কর্মকর্তার শুধু গাড়ি ভাতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের গবেষণা বরাদ্দের চেয়েও বেশি। এই না হল শিক্ষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা! পাঠক, এই হল অবস্থা। এবার বলুন তো আমাদের বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে কীভাবে?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিংয়ের এ অবস্থার আরেকটি কারণ হচ্ছে গবেষণা কাজে ভালো ছাত্রছাত্রীর অভাব। আমি যখন পিএইচডি করেছি, তখন দেখেছি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত একঝাঁক গবেষক কীভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভাগের জন্য কাজ করছেন। প্রফেসর (সুপারভাইজার) কখন এলো বা গেল কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কীভাবে এবং কেমন করে গবেষণা ফল আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করা যায়। আমাদের সুপারভাইজারের কাজ ছিল কাজের ফলাফল বা অগ্রগতি দেখে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হওয়া। এভাবেই একদল গবেষকের কাজের উৎকর্ষের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম। ফল ভালো র‌্যাংকিং।

কিন্তু দুঃখজনক, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার এরকম পরিবেশ গড়ে উঠেনি। অর্থের অভাব এবং রাষ্ট্রের কিছু ভ্রান্তনীতি ভালো ছাত্রছাত্রীদের লোভী ও গবেষণাবিমুখ করে ফেলেছে। বিনা স্কলারশিপ বা সামান্য পেট খরচে যারা বর্তমানে গবেষণা করছেন, তাদের ওপর ভর করেই ধুক ধুক করে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রছাত্রীরা কেন গবেষণায় আসছে না, সে ব্যাপারে ড. রাগিব হাসানের লেখার একজন পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কিছু অংশ তুলে ধরলাম। তিনি বলেছেন, ‘কীভাবে র‌্যাংকিংয়ে থাকবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থীর ধ্যানজ্ঞান সব হল বিসিএস দিয়ে পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়া। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের যে অবস্থা তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সাবজেক্ট তুলে দিয়ে একটা বিষয় পড়াতে হবে, সেটার নাম হল বিসিএস। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে সাধারণ জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক’।

ছাত্রছাত্রীরা বিসিএস দিয়ে এসব চাকরিতে কেন যেতে চায়, তা আমরা সবাই জানি। এসব চাকরিতে সরকার দিয়েছে অঢেল সুযোগ-সুবিধা। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা গবেষণায় কেন আসতে চায় না, সেটিও আমাদের অজানা নয়। গবেষণায় আছে অমানুষিক পরিশ্রম এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ভালো ছাত্রছাত্রীদের মনে প্রশ্ন, কেন তারা অপরিসীম কষ্ট এবং দীর্ঘ সময় ব্যয় করে গবেষণা করবে? সরকারের কি উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের কোনো প্রয়োজন আছে? সরকারের নীতিমালায় কি তাদের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে? না, গবেষকদের জন্য এসব কিছুই সরকারের নেই। তাহলে গবেষণা করবে কারা এবং কেন? আমরা কি ভালো স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশ থেকে গবেষক আনতে পারব? আমাদের বিসিএস পাস করা সরকারি চাকরিজীবীরা কি কষ্ট করে গবেষণা করবে? তারা তো বিনা ডিগ্রিতেই সর্বোচ্চ পদে আসীন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং পাওয়ার পথে বাধা অনেক। আমি কিছু আলোকপাত করেছি মাত্র। বাধাগুলো অতিক্রম করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একার পক্ষে অসম্ভব। প্রয়োজন সরকারের সত্যিকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, যা অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও নেই এবং অদূর ভবিষ্যতেও পরিলক্ষিত হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের না আছে অর্থ, না আছে গবেষক, না আছে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। অন্যদিকে সরকারের না আছে কোনো নীতিমালা, না আছে এসব নিয়ে ভাবনার সময়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নিয়ে জনগণের আছে আবেগ, ভালোবাসা, কথার ঝুড়িমালা এবং অভিযোগ।

হ্যাঁ, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক দোষ আছে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতা এবং সীমিত বরাদ্দ সত্ত্বেও এখনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লেখাপড়ার মান যথেষ্ট ভালো। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এখনও সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল। তবে ভালো র‌্যাংকিং পেতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এবং শিক্ষার মান অবশ্যই বাড়াতে হবে। সর্বাগ্রে বন্ধ করতে হবে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, লোক দেখানো গবেষণা বরাদ্দ এবং সরকারের ভ্রান্তনীতি। এজন্য প্রয়োজন সরকারের সত্যিকার সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আমার জিজ্ঞাসা, আদৌ কি এরকম কিছু করার ইচ্ছা এবং পরিকল্পনা সরকারের বা আমাদের আছে?

ড. এমএলআর সরকার : প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইলঃ lrsarker@yahoo.com

Comments

comments