ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াঃ প্রয়োজন সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিশেষ করে ঢাকায় ডেঙ্গুর ব্যাপক প্রকোপ দেখা দিয়েছে। তবে এবারের ডেঙ্গুর ধরনকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে, ২৪ জুলাই মঙ্গলবার এক দিনেই ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে চারশো ৭৩ জন। জুনের দ্বিগুণেরও বেশি ডেঙ্গু রোগী জুলাইয়ে। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালকে মশার মৌসুম ধরা হয়। সেই হিসাবে, সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়ে গেছে।

মশা ও মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এসময় চলে নানা কর্মসূচি, হাতে নেওয়া হয় বড় বড় কর্মপরিকল্পনা, বৃদ্ধি হয় বাজেট। এভাবে মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। ঢাকার সিটি কর্পোরেশন মশার ঔষুধের কার্যকারীতা নিয়ে এখনও অন্ধকারে আছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ- আইসিডিডিআর,বি ঢাকায় ব্যবহৃত ওষুধে মশা না মরার প্রমান মিলেছে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় হতে পারে, প্রথমত ব্যবহৃত কীটনাশকের পরিমান ও গুনগতমান এ সমস্যা এবং দ্বিতীয়ত মশার মধ্যে কীটনাশক বা বালাইনাশক প্রতিরোধী সক্ষমতা তৈরি হওয়া। তাই জনস্বার্থে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে বিষয় দু’টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এমতবস্থায় মানুষকে মশার হাতে ছেড়ে দিয়ে সিটি কর্পোরেশনগুলো নতুন কার্যকরী ঔষুধ আমদানির অপেক্ষায় থাকবে, না কি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? অবশ্য এক সিটি কর্পোরেশন বলেছিল নিবন্ধন নেই এমন নতুন ওষুধের অনুমোদন নেওয়া যেহেতু একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া তাই তারা বিকল্প হিসেবে “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার” অনুমোদন নিয়ে নতুন ওষুধ ও নতুন কম্পোজিশন আমদানি করবে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নতুন কোন কীটনাশক আমদানি সমীচিন হবে না।

বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা নিয়ন্ত্রনাধীন ”বালাইনাশক ও মান নিয়ন্ত্রন” কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ৭৩ টি উপাদান রয়েছে (ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী)। এগুলোর মধ্যে কিছু একক উপাদান এবং কিছু যৌথ উপাদান বা মিশ্রণে তৈরি। নিশ্চয়ই সবগুলো মশার বিরুদ্ধে অকার্যকর নয়। এসব অনুমোদিত বালাইনাশকের মধ্যে থেকে কার্যকরী বালাইনাশক খুজে পাওয়া জঠিল কিছু নয়। তাছাড়া আইসিডিডিআর,বি ইতিমধ্যে পারমেথ্রিনের পরিবর্তে ম্যালাথিয়ন ও ডেল্টামেথ্রিন ব্যবহার করতে সুপারিশ করেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে মশার লার্ভা (বাচ্চা) মারতে মেলাথিওন সবচেয়ে কার্যকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ডাইমেথোয়েট, ফেনিট্রোথিওন, ডেল্টামেথ্রিন, ক্লোরপাইরিফস্ এর কার্যকারীতাও দেখতে পান তারা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অরগানোফসফরাস ও পাইরিথ্রইডস গ্রুপের বালাইনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে উঠার রিপোর্ট রয়েছে। আমাদের দেশে ব্যবহৃত বালাইনাশকের প্রতি মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এছাড়া কৃষিকাজে পোকা মাকড় দমনে অপরিমিত কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহারে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে এসব রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। তাই মশা নিধনে অবশ্যই নতুন নতুন বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি এসব বালাইনাশকের উপর মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রতিহত করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন- অরাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার, জৈব নিয়ন্ত্রক, পরিবেশে ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা। আমরা অনেকেই মনে করি মশা নিয়ন্ত্রণ মানে মূলত স্প্রে করা কিন্তু মনে রাখতে হবে স্প্রে করা হল সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ছোট একটি অংশ মাত্র। এজন্য মশা নিয়ন্ত্রণে মোট বাজেটের সিংহভাগ মশার প্রজনন রোধে ব্যবহার করতে হবে।

প্রকৃতিতে ডেঙ্গুর ও চিকুনগুনিয়ার অবস্থান

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া বছরের বিশেষ সময়ে কোথা থেকে আবির্ভাব হয় তা নিয়ে আমরা কেউ ভাবি না। আমাদের প্রকৃতিতেই এসব জীবানু তাদের জীবনচক্র রক্ষা করে চলছে। মশা বংশ পরম্পরায় এসব জীবানু বহন করতে পারে অর্থ্যাৎ ডিমের মাধ্যমে বাচ্চাতে এসব জীবানু সংক্রমিত হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস সাধারণত মানুষ ও মশার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বানর, কুকুর, বাদুরসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীতে এর অস্তিত্ব মিলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে চিকুনগুনিয়া মানুষ ছাড়াও বানর, বাদুর, ইঁদুর ও পাখিতে হতে পারে। মহামারীর সময় আক্রান্ত এলাকার পশুপাখিতে এসব ভাইরাস ছড়িয়ে যেতে পারে এবং সুপ্ত অবস্থায় দীর্ঘদিন রয়ে যেতে পারে। এছাড়া এডিস মশার ডিম শুষ্ক অবস্থায় প্রায় নয় মাস বেঁচে থাকতে পারে এবং সামান্য পানির সংষ্পর্শে এলে ডিম ফুটে বাচ্চা বেড়িয়ে আসে।

সমন্বিত পদক্ষেপ
নির্দিষ্ট সময় দিয়ে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় মৌসুমে এডিস মশা সক্রিয় থাকে, তবে বর্ষার সময় এদের আধ্যিক্য দেখা যায়। তাই এই সময়টিতে জরুরি ভিত্তিতে মশা মারতে প্রয়োজনীয় কীটনাশক আক্রান্ত এলাকাগুলোতে মটরযানে বা হেলিকপ্টারে করে স্প্রে করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে নিয়মিত ময়লা অবজর্না পরিষ্কার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এলাকাভিত্তিক জনগনকে সম্পৃক্ত করে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ সাপেক্ষে অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। মশা ও অন্য রোগবাহী কীট নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি জেলায় স্থানীয় ইউনিট তৈরি করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সারাবছর কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

পানিতে থাকা অবস্থায় মশার প্রজনন স্থান নির্ণয় ও নির্মূল করা মশা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ন ও কার্যকরী অংশ। এডিস মশা স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে সেখানাকার মশার লার্ভা নষ্ট করতে হবে এবং এসব জায়গায় যাতে পানি জমে থাকতে না পারে বা মশার প্রজনন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু নিজের জায়গাটুকু পরিষ্কার রাখলেই চলবে না আশে পাশের জায়গাটুকু যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে সেদিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

মশার বাসস্থানের পানিতে কেরোসিন বা মবিল ঢেলে মশার প্রজনন রোধ করা যায়। পানিতে কেরোসিন বা মবিল ব্যবহার পরিবেশ বান্ধব নয়। এসবের পরিবর্তে সয়ারিন, নিম বা অন্য যেকোন সহজলভ্য তেলজাতীয় পরিবেশ বান্ধব পদার্থ ব্যবহার করে মশার প্রজনন রোধ করা যায়। এক্ষত্রে এসব পদার্থ পানির উপরে একটি স্তর তৈরি করে মশার লার্ভাকে অক্সিজেন নিতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে লার্ভাগুলো সহজেই মারা যায়। ১০০ বর্গফুটে ১চা চামচ ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু মাছ চাষের জায়গায় তৈলজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না এতে মাছও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবে। এভাবে বাড়ীর আশে পাশে, বস্তিতে, পরিত্যাক্ত জায়গায় বা ড্রেনের জমে থাকা পানিতে তেল ব্যবহার করে সহজেই মশার প্রজনন রোধ করা সম্ভব। ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করেও মশার লার্ভা মারা যায়।

গবেষণার বিষয়
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কীটপতঙ্গের প্রজনন বেড়ে যেতে পারে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও কালের আবর্তে পরিবর্তিত হতে পারে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া সংক্রমনের ধরণ। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এডিস মশার প্রজননে যে সব গুরুত্বপূর্ন বিষয় বা উপাদান কাজ করছে তা খুঁজে বের করতে হবে। মশার ঋতুতে দেশজুড়ে মশার বিস্তারের একটি মানচিত্র তৈরি করতে হবে। কোন এলাকায় কোন জাতের মশা পাওয়া যায় তার একটি পরিষ্কার চিত্র থাকা প্রয়োজন। প্রতিবছর একবার হলেও মশায় ব্যবহৃত বালাইনাশকের প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না তা মনিটরিং করা প্রয়োজন। একই মশায় ও প্্রানীদেহে একইসাথে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থাকতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ফলপ্রদ নিয়ন্ত্রনে মশা ও মানুষের পাশাপাশি অন্য উৎসগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। যেমন- গৃহপালিত ও বন্য প্রাণি এবং বন-জঙ্গলে থাকা এডিস ও অন্যান্য মশায় এসব রোগের জীবানু আছে কি না তা সনাক্ত করা প্রয়োজন এবং বিদ্যমান ভাইরাসের জিনগত বৈচিত্র নিরূপন করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া আমাদের জাতীয় সমস্যা, তাই আতঙ্কিত না হয়ে এসব রোগের নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার মত আমরাও মশাবাহিত রোগমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে পারব।

লেখকঃ
প্রফেসর, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
szaman@bau.edu.bd

Comments

comments