লাল ফিতার দৌরাত্ম্য অফিস থেকে বাহিরে

নিউজ ডেস্কঃ

লালফিতার দৌরাত্ন্য বলতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অথা আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি বোঝায় । আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসনিক কাজ জরতে গিয়ে যখন দেশের সাধারণ জনগণকে হয়রানির শিকার হতে হয়,দিনের পর দিন সরকারী অফিসে গিয়েও ফাইল এক টেবিল থেকে আর এক টেবিল অবদি পৌঁছায় না ঘুষ নামক বামহাতের ব্যাপারের ভিড়ে আমজনতা যখন অসহায় আর উল্টো দিকে অফিসারের টেবিলে ফাইলের পর ফাইল জমতেই থাকে এটাকেই বলে লালফিতার দৌরাত্ন্য (ঈশরাত জাহান ঈশিতা)

এক সময় ফাইল বাঁধতে লাল ফিতা ব্যবহার করা হত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বোঝাতে ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ কথাটি প্রচলিত হয়। এখন লাল ফিতার বদলে ব্যবহার করা হয় সাদা ফিতা। তবে আমলাদের এ  দৌরাত্ম্য ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় গোটা দেশ ও রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রেখেছে বলে মনে করা হয়।

স্বাধীন দেশে আমলারা শুরু থেকেই সুবিধাভূগী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনা ও দূর্ঘটনা তাদের লাগামহীন দৌরাত্মের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন দেশের জনগন।

  • অতিরিক্ত সচিবের কারণে ফেরি আটকে থাকে বলে অ্যাম্বুলেন্সে মুমূর্ষু রোগী মারা গেছে৷
  • একজন কারা কর্মকর্তার বাড়িতে ঘুসের ৮০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে৷
  • সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্ব করতে যান সরকারি কর্মকর্তারা আর তার দেখভাল করতে গেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার৷
  • সরকারি কর্মকর্তার পানিতে পড়া মোবাইল উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সরকারি ডুবুরি দল৷
  • একজন অতিরিক্ত সচিব গবেষণার জন্য একজন অধ্যাপককে হুমকি-ধমকি দেন৷
  • প্রতিযোগীদের ছাড়াই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গেলেন নাসায়৷
  • ট্রেনে সিগারেট খাওয়াতে বাধা দেওয়ায় চিকিৎসককে পা ধরানো।
  • সরল বিশ্বাসে করা কোনো কাজ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে না— দুদক প্রধানকে পেনাল কোড  স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় ডিসি সম্মেলনে

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য যেন না থাকে এ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সাবধান করে দিয়েছেন আমলাদের (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৩ জুলাই, ২০১৮। 

এছাড়া এ নিয়ে প্রকাশিত হয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন ও মতামত-

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য (শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৪; বাংলাদেশ প্রতিদিন)

বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা কি- এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বৈদেশিক সহায়তার এক বড় অংশ ছাড় করা সম্ভব হয় না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সস্তা শ্রম ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি সত্ত্বেও যে সব কারণে বাংলাদেশমুখী হন না তার মধ্যে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা অন্যতম। দেশের সরকারি দফতরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এত বেশি যে সাধারণ মানুষকে নূ্যনতম সেবা পেতেও নাকানি চুবানির শিকার হতে হয়। জনগণের ট্যাক্সে টাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও এর বিনিময়ে সেবা দানে রয়েছে সীমাহীন কার্পণ্য। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সরকারি দফতরগুলোর কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। এ স্থবিরতা মানুষের কাজের গতি থামিয়ে দিচ্ছে। নষ্ট করে দিচ্ছে সব উদ্যোগ, উদ্যম ও তৎপরতা। বাড়ি বানাতে গিয়ে নকশা অনুমোদনে যেমন সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তেমনি সরকারিভাবে কোনো জমি অধিগ্রহণ হলে ক্ষতিগ্রস্তরা দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও পায় না ক্ষতিপূরণ। পানির লাইন নিতে গেলে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। বিদ্যুতের ভৌতিক বিল সংশোধন করতে গেলে হয়রানি পোহাতে হয় দিনের পর দিন। লাল ফিতায় আটকে আছে শিক্ষক-কর্মচারীদের টাইম স্কেল ও এমপিওভুক্তি। এজি অফিসেও ভোগান্তি চরমে। সেবা খাতের এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নেই। যে কোনো কাজের জন্য ভুক্তভোগীদের দিনের পর দিন বিভিন্ন দফতরে ঘুরতে হয়। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত, এজি অফিস, ডেসা, ওয়াসা, পাসপোর্ট অফিস, ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) উত্তর ও দক্ষিণ, রাজউক, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দফতরে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য অতিষ্ঠ করে তুলেছে সেবাগ্রহীতাদের। দেশের মানুষ সরকারি দফতরগুলো থেকে যে সেবা পায় সেগুলো কারোর দয়া-দাক্ষিণ্য নয়। এটি সাধারণ মানুষের অধিকার। দেশবাসীর দেওয়া ট্যাক্সে টাকায় যেহেতু সরকারি অফিসগুলো পরিচালিত হয়, সেহেতু তাদের সেবা নিশ্চিত করা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কর্তব্য হওয়া উচিত। দেশের উন্নয়ন এবং নাগরিকদের কাছে সরকারের সেবা পৌঁছাতে হলে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে থামাতে হবে।

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক: উন্নয়নের স্বার্থে আমলাতান্ত্রিকতার অবসান চাই (১ জানুয়ারি, ২০১৭;বাংলাদেশ প্রতিদিন)

বলা যায়, লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিটি সরকারি অফিস-আদালতের কার্যক্রম। সচিবালয় থেকে শুরু করে প্রতিটি অফিস-আদালত, মন্ত্রণালয়, দফতর-অধিদফতর, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতালসহ সরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য জেঁকে বসেছে। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিক গতিতে কোথাও কাজ হয় না বললেই চলে। তদবির, প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা আর্থিক লেনদেন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করেন না এটি একটি ওপেন সিক্রেট। এক কথায় বলতে গেলে ফাইল নড়ছে না সরকারি দফতরগুলোতে।

‘লাল ফিতার’ দৌরাত্ম্য কতটা, দেখতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম; 24 Jan 2019)

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘লাল ফিতার দৌরাত্ম্য’ কতটা গভিরে গেছে, তা দেখতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। লাল ফিতার গভীরতা’ দেখে নিতে চান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “এ জন্য আমাকেও একটি স্টাডি করতে হবে। লাল ফিতাটা কতটা গভীরে, সেটাও দেখতে হবে। আমরা চাই আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসুক। আমরা এজন্য সবকিছু সহজ করতে চাই।”

আমলাতন্ত্র ও ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য’ – samakal

আমলাগোষ্ঠীর মধ্যে ৯০ শতাংশই যে আলস্যপ্রিয়, দেশপ্রেমহীন মনমানসিকতা, অসাধু, অদক্ষ, মানবিকতার বোধহীনতায় আক্রান্ত যন্ত্রবৎ কিছু মানুষ, তা তারা শত শত বছর ধরে প্রমাণ করে এসেছেন এ দেশে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন সিনিয়র সাংবাদিকের কাছে আমাদের আমলাগোষ্ঠী সম্পর্কে কিছু ঘটনা জেনেছি, যা এখানে অবশ্যই উল্লেখ করার মতো বিষয়। এককালে এ দেশের প্রধান দৈনিকটির সেই রিপোর্টার (পরিশ্রমী রিপোর্টারই জানি তাকে, মিথ্যাচারও করেন না তিনি), তিনি ‘৭৭ সালে গেছেন এককালের প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের বাড়িতে (তখন তিনি বয়োবৃদ্ধ রাজনীতিক, পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ তার একটা অভ্যাসের বিষয়) তার একটা সাক্ষাৎকার নিতে। আতাউর রহমান খান ওই রিপোর্টারকে বললেন, ‘দেখো, আমাকে শেখ মুজিবুর রহমান (অনেক পরে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আরও পরে রাষ্ট্রপতি) সেই পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকেই বলেছিলেন- ‘ভাইসাব, আমলাদের মাথায় উঠতে দেবেন না, তারা কিন্তু পেয়ে বসবে, কাজ করাতে পারবেন না।’ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওই রিপোর্টারকে বললেন, ‘দেখো, আমিও ব্যাপারটার প্রমাণ পেয়েছি হাতেনাতে।

আমলাদের দৌরাত্ম্য : প্রকাশ্যে সমালোচনায় আ’লীগ নেতারা

সর্বশেষ আমলাতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। আমলাদের তিনি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ এর সঙ্গে তুলনা করেন। এর আগে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ আমলাতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। যার যে কাজ তাকে সেই কাজ করতে দিতে হবে। আমলারা কোন সুপারম্যান না যে তারা সকল ধরণের কাজ সুসম্পন্ন করতে করতে পারবেন। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রতিটি মন্ত্রনালয় বা বিভাগের প্রতিনিধি আছে তাদেরকে তাদের কাজ স্বাধীনভাবে করতে দিতে হবে, তাদের কথা তাদেরকেই বলতে দিতে হবে। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাও আমলা নির্ভর হওয়ায়  শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

 

 

Comments

comments