নিরাপদ দুধের আকাঙ্খা

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

দুধে ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও সংকট এখন কাটেনি। আশংকায় রয়েছে দেশে সাধারণ জনগন এবং হুমকির মুখে পড়েছে দেশীয় দুগ্ধ শিল্প, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দুগ্ধ খামারী ও দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকরা। এমতবস্থায় সংকট নিরসনে প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও দিক নির্দেশনা। এক্ষেত্রে যে কাজটি করা জরুরি সেটি হল বাজারে সরবরাহকৃত সকল প্যাকেটজাত দুধ (তরল ও গুড়ো) পরীক্ষা করা এবং ক্ষতিকর পদার্থ ও জীবানুর উপস্থিতির উৎস খুজে বের করে দেশবাসীর কাছে বিষয়গুলো পরিষ্কার করে তুলে ধরা।

এক্ষেত্রে প্রথমত যে কাজটি করা যেতে পারে সেটি হল বাজারের সরবরাহকৃত সকল প্যাকেটজাত দুধ (তরল ও গুড়ো) কোথা থেকে আসছে তা খুঁজে বের করা; তরল দুধগুলো পাউডার দুধ থেকে তৈরি নাকি খামারী বা কৃষকদের গাভী থেকে সংগৃহীত দুধ থেকে তৈরি তা জানা? সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ দ্বারা এ কাজটি সহজেই করা যেতে পারে। যদি তরল দুধ পাউডার দুধ থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে তাহলে বাজারে প্রাপ্ত পাউডার দুধগুলো দ্রুত সংগ্রহ করে সেগুলোতে সিসা, ক্যাডমিয়াম, অ্যান্টিবায়োটিক ও জীবানুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা যেতে পারে। এখন ধরা যাক পাউডার দুধ থেকে তৈরি তরল দুধে যদি ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে দুটি বিষয় হতে পারে এক. পাউডার দুধে এসব পদার্থ থাকতে পারে, দুই. পাউডারের সাথে মেশানো অনিরাপদ পানিতে এসব পদার্থ ও জীবানু থাকতে পারে।

ঠিক একইভাবে যেসব প্যাকেটজাত তরল দুধ সরাসরি খামারী, কৃষক বা ভেন্ডারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এসব দুধে যদি ক্ষতিকর পদার্থ ও জীবানু পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে তিনটি বিষয় হতে পারে। এক. গাভীর দুধের মাধ্যমে এসব পদার্থ আসতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি গাভীটিকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয় যার প্রত্যাহারকাল এখন শেষ হয়নি অথবা গৃহীত খাবারে যদি এসব ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। আবার খাবারের মধ্যে দু’ভাবে এসব পদার্থ আসতে পারে, সেটি হতে পারে প্রকৃতি থেকে (দুষিত মাটি ও পানি থেকে প্রাকৃতিক খাবারে) অথবা ব্যবহৃত অন্য কোন প্রস্তুতকৃত গোখাদ্য থেকে। দুই. গাভীর নিরাপদ দুধে অনিরাপদ পানি মেশালে। তিন. সংগৃহীত দুধ কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হলে।

গাভীর দুধ প্রদানের সময়কালে যদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় বিশেষ করে গাভীর ওলান ফোলা রোগে (ম্যাসটাইটিস) অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় যা কিনা খামারীরা অজ্ঞতাবশত হোক বা আর্থিক লালসায় হোক অ্যান্টিবায়োটিক প্রত্যাহারকাল আমলে না নিয়ে উক্ত দুধ বাজারজাত করে থাকেন। যা কিনা অন্য নিরাপদ দুধের সাথে মিশ্রিত হয়ে বাজারে আসতে পারে।

সাধারণত দেখা যায় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খামারী, কৃষক বা ভেন্ডারের কাছ থেকে বিভিন্ন পয়েন্টে দুধ সংগ্রহ করে সবগুলো একটি বড় পাত্রে মিশিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটি অনিরাপদ দুধ অন্যসব নিরাপদ দুধকেও অনিরাপদ করতে পারে। এছাড়া খোলা বাজারের দুধ বা অনুমাদনবিহীন প্যাকেটজাত দুধ বিক্রি করা হয় স্থানীয় হাটে-বাজারে যেগুলোও এসব ক্ষতিকর পদার্থ ও জীবানুর উৎস হতে পারে।

দুধে প্রাণিজ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও মানুষে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে যেটি নিঃসন্দেহে কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়। দুধ পাস্তুরিত হলেও সেখানে জীবানু থাকতে পারে। সেই জীবানু যাতে বৃদ্ধি না পায় এবং দুধটি যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য দুধে সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোন ক্ষতিকার পদার্থ ব্যবহার করা হয় কিনা সেটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আবার দুধে ডিটারজেন্ট এর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ভয়ানক বার্তা প্রদান করে। অসৎ খামারী, ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দুধের চর্বি সরিয়ে নিয়ে কোন তেল জাতীয় পদার্থ দুধে দ্রবীভুত করতে ডিটারজেন্ট ব্যবহার করে কিনা তাও খতিয়ে দেয়া প্রয়োজন।

পাস্তুরিত তরল দুধে জীবানু থাকলে তা হয়তবা দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে খেলে জীবানু মুক্ত হতে পারে কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতুর কি হবে? এসব অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি সহনীয় মাত্রায় না থাকলে অথবা দীর্ঘদীন ধরে অল্প অল্প করে শরীরে জমতে থাকলে তার ক্ষতিকর প্রভাব অবশ্যই পড়বে। এছাড়া অল্প পরিমান এন্টিবায়োটিক শরীরে জীবানুর প্রতিরোধ সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে।

বিদেশ থেকে গুড়োদুধ আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে দেশীয় শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক খামারী বা দুগ্ধ উপৎপাদকারী ব্যক্তি বা পরিবারকে নিবন্ধেনের আওতায় আনা, তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদান, মনিটরিং এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। ভেটেরিনারিয়ানদের তদারকি ছাড়া কোন দুধ যাতে সংগৃহীত না হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া যাতে কোন ব্যক্তি বা খামারীর কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে দুধ দোহন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যে কোন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তিগত ব্যবহার ও মান নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেকে সেটি মনে রাখতে হবে। আবার দেশী শিল্পকে আবেক দিয়ে রক্ষা করতে গিয়ে দেশবাসীকে যাতে বিষ পান করতে না হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের মিলিটারি ফার্মগুলোতে ভেটেরিনারিয়ানরা নিশ্চয়ই নিরাপদ দুগ্ধ উৎপাদন করে সেই সেক্টরে পুষ্টি যোগাতে কাজ করে যাচ্ছে। সেখান থেকেও আমরা শিখতে পারি।

এছাড়া যে বিষয়টিতে আমরা এখন গুরুত্ব দিতে পারিনি সেটি হল প্রকৃতির স্বাস্হ্য সুরক্ষা। শিল্প ও কল-কারখানার বর্জ্য, বিভিন্ন ধরনের, গাড়ির পোড়া মবিল, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ময়লা-আবর্জনা, পয়নিষ্কাশন সহ অসংখ্য উৎস থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবেশকে দুষিত করছে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। ফসলে কীটনাশক, মাছ চাষে এন্টিবায়োটিক বা ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহৃত হলে সেখান থেকেও পানি ও মাটি দুষিত হতে পারে। আবার জৈব বা অর্গানিকের নামে আমরা যেসব অশোধিত পশুপাখির মল ও বিষ্টা ব্যবহার করছি তাও খাবারে সংক্রমিত হতে পারে। তাই প্রকৃতি সুরক্ষা করতে এখনই আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

একটি বিষয় লক্ষনীয় ইউটিউব, ফেজবুক সহ বিভিন্ন মিডিয়াতে রান্নাবান্নার অনুষ্ঠানে কিছু দুধের প্যাকেটসহ ব্যবহার দেখানো হয় যা কিনা মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। যেহেতু বাজারে সরবরাহকৃত সকল দুধের (তরল বা গুড়ো) মান নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে, এসব দুধের মান নিয়ন্ত্রন ও নিরুপন না করা পর্যন্ত প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আসা উচিত বলে আমি মনে করি।

যাই হোক দেশের মাটি, বায়ু, পানি যেভাবে প্রতিনিয়ত দুষিত হচ্ছে তা সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে আমরা যা খাচ্ছি বা পাচ্ছি সেগুলোর মান সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন করা না গেলে অদুর ভবিষ্যতে মায়ের দুধেও যে ক্ষতিকর পদার্থ পাওয়া যাবে না তা বলা যাবে নাা।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দুধে যেহেতু ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সেটি ক্ষতিকর পরিমানে আছে কিনা বা সহনীয় মাত্রায় আছে কিনা তা দেশবাসীকে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। জনমনে বিভ্রান্তি দুর করতে এসব ক্ষতিকর পদার্থের উৎস কোথায় তাও জানানো উচিত। হাইকোটোর নির্দেশে ও সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় এবং কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়গুলো পরিষ্কার হলে জনমনে আতংক কেটে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। সন্দেহ, ষড়যন্ত্র, কর্তৃত্ব, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের উর্ধে এসে দেশ প্রেম নিয়ে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। আশা করি দুগ্ধ শিল্পে বিরাজমান সংকট কাটিয়ে এ শিল্প সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং দেশের জনগন নিজেদের উৎপাদিত দুধ নিরাপদে পান করতে করতে পারবে এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

 

প্রফেসর ও লেখক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
szaman@bau.edu.bd

(Visited 4 times, 1 visits today)