প্রিয়া সাহার বক্তব্য এবং মার্কিন পদক্ষেপ: একটি পর্যালোচনা

ড. মোঃ সাইদুর রহমান

পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নিকট বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের অভিযোগ পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত ঝড় তুলেছিল। বিষয়টি ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অভিযোগকারীর ব্যক্তি পরিচয়জনিত কারনে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তার চেয়েও যেটি বড় তাহলো ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি অবহিত হয়েছেন এবং মৌলবাদী উগ্রপন্থীরা এগুলো করে যাচ্ছেন যার কোন বিচার সংখ্যালঘুরা পাচ্ছেন না। তিন কোটি ৭০ লক্ষ ধর্মীয় সংখ্যালঘু গায়েব বা গুম হয়ে গেছেন এ খবরটিতে অনেক সন্দেহ দানা বেঁধেছে। বিষয়টি ট্রাম্পের নিকট বলায় সারা পৃথিবীতে খবরটি গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হচ্ছে। প্রিয়া সাহার ব্যক্তি পরিচয়ের চেয়ে সাংগঠনিক পরিচয়ে মানুষের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। মার্কিন দূতাবাস কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে হোয়াইট হাউজে পৌঁছানোর বিষয়টিও সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে অপহরন, গ্রেফতার, গুম, খুন বহুল প্রচলিত শব্দ এবং এগুলোর সাথে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকায় মানুষ অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছে যদিও তা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য কোনভাবেই কাম্য নয়। বিএনপি বা জামাত থেকে এর পুনরাবৃত্তি হলে এটি প্রচার মাধ্যমের দৈনন্দিন খবরে পরিনত হত। কিন্তু প্রিয়া সাহা তাঁর বক্তব্যে কি বুঝাতে চেয়েছেন তা পরিস্কার না হওয়াতে পুরো বিষয়টা নিয়ে গুমোট অবস্থা বিরাজ করছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা গুম হয়ে যাচ্ছেন- বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এটি খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য নয় বরং জনসাধারনের মধ্যে কানাঘোসা রয়েছে যে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। এটি বলার সাথে সাথে অন্য সময়কালে তারা যে অত্যাচার ও নিপীড়নের স্বীকার হয়েছিলেন এটা চলে আসে যার সাথে প্রিয়া সাহার অভিযোগকে কিছুটা মেলানো যায়। এটা বিশ্বাসযোগ্যও হয় একারনে যে, বিভিন্ন সময়ে এর স্বপক্ষে যথেষ্ট দৃষ্টান্ত পাওযা যায়। বর্তমান সময়েও অনেক অনাকাংখিত ঘটনা ঘটছে যার মধ্যে সংখ্যালঘুদের বিষয়টিও যে নেই তা অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে সরকারের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে সবসময়ই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। শেখ হাসিনার সরকারের শাসনামলে সংখ্যালঘুরা প্রশাসনের বিভিন্ন সুবিধাজনক পদে বেশি নিয়োজিত আছেন এটা খোদ সংখ্যালঘুরাও অস্বীকার করতে পারবেন না। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় সেই শেখ হাসিনার সময়ে বিশাল সংখ্যায় সংখ্যালঘু গায়েব বা গুম হওয়ার তকমা লেপনটা কতটা কাঙ্খিত ছিল? প্রিয়া সাহার কথায় কি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিশেষ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না? যাচাই-বাছাই না করে ব্যক্তি বিশেষের কথায় মার্কিন প্রশাসন দ্রুত কোন পদক্ষেপ নিবেন -এটির আশংকা খুব একটা নেই বলে আমার ধারনা । আর অন্য একটি দেশের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কি-ই-বা  এতো করার আছে তাও মেলাতে পারছি না। যতদূর জানা গেছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবছরের একটি নির্ধারিত অনুষ্ঠান। সেখানে বিশেষ কৌশলে  অতি স্পর্শকাতর একটি বিষয় অভিযোগ আকারে উপস্থাপন করতে পারায় প্রিয়া সাহার ব্যক্তিগত লাভ হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যে সমাজের মানুষের তিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁদের কতটা মঙ্গল তিনি করতে পারলেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারন এসব স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়গুলো সহজে মানুষের মন থেকে মুছে যায় না। তাই হুট করে কিছু বিশৃংখলা করে ফেলাটাও অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংস্কৃতি স্থিতিশীল রাখতে অভিযোগকারীর অভিযোগের প্রকৃত কারন জানা জরুরি তা না হলে তার ক্ষতিকর প্রভাব সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনিতেই পার্শ্ববর্তী দেশের কিছু ধর্মীয় চর্চার ধরন বাংলাদেশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে তার উপর বর্তমান অভিযোগ বোঝার উপর শাকের আঁটি যোগ হয় কিনা তা অনুধাবন করা দরকার। এটা সত্য যে, বিগত সময়ে শেখ হাসিনার সরকার অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় উদ্ভুত পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন এবং এক্ষেত্রেও দিবেন এটা যেমন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ঠিক একইভাবে উক্ত সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়দেরও উচিত হবে প্রিয়া সাহার বিষয়ে যতটা সম্ভব তথ্য দিয়ে সহায়তা করা। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় বিভাজন সৃস্টি করে রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া কিছুটা কঠিন তবে তা অসম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে কিছু সংখ্যক স্বার্থান্নেষী মহল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সংখ্যালঘুদের উপর অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের মাধ্যমে আত্মরক্ষার সুযোগ নেয়।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত বর্ধণশীল দেশ। এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় না থাকুক এটা আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই চাইতে পারে। আমাদের উচিত হবে তাঁদের এ ফাঁদে পারা না দিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্র ও ঐতিহ্য অটুট রেখে সমস্যার সমাধান করা। আশা করি জাতির জনকের আদর্শে লালিত স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির সরকার সময় ক্ষেপণ না করে ব্যবস্থা নিবেন যাতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারেন। ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থ হাঁচিলের জন্য অতি উৎসাহিত হয়ে প্রিয়া সাহার বিরূদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করছেন। এতে প্রিয়া সাহারই লাভ শতভাগ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তিনি এটাই চাচ্ছেন যাতে উনার দেশে ফেরা না লাগে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রিয়া সাহার কিছু সাক্ষাতকারের ভিডিও চিত্র এবং শারীরিক অবয়বের ভাষা তা-ই প্রমান করে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে কথা বলা, ঐকিক নিয়মে ৩ কোটি ৭০ লক্ষের সংখ্যা মেলানো এবং অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতসহ অন্যান্যদেরকে জরিয়ে কথা বলায় তাঁর বিষয়ে সমাধানে আসার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করছে বলে মনে হয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পৃথিবীব্যাপী সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি খুবই আপেক্ষিক। অসংগতি কোথায় নেই তবে তার মাত্রা কেমন এটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এবং অন্যান্য ধর্মালোম্বীদের মধ্যে বিদ্যমান সম্প্রীতি ভাল এটা দাবী করা যায়। কেবল জ্ঞানচক্ষু দিয়ে অনুধাবন করলেই তার বাস্তব মাত্রা আরো বেশি বুঝা সম্ভব। প্রিয়া সাহাকে ফিরিয়ে এনে তাঁর বক্তব্য জানা এবং তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে মর্মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিব্যক্তি যথার্থ এবং সঠিক। তবে ভবিষ্যতে এধরনের পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি না ঘটুক তার যেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন দরকার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এবং চাপা মনকষ্ট লাগভ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনও জরুরি। আশা করি প্রিয়া সাহা সরকারের সংশ্লিষ্ঠ সংস্থাকে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যথাযথ সত্য তথ্য দিয়ে  পরিস্থিতি উত্তরণে সহযোগিতা করবেন এবং দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

লেখকঃ অধ্যাপক ড. মোঃ সাইদুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ইমেইল: saidur.rahman@bau.edu.bd

Comments

comments