সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সুফল কি মিলবে

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

মতামত

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত বা গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু না হলেও এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে ইতিবাচক মনে হলেও যাদের জন্য এই পরীক্ষা পদ্ধতি তারা সত্যিকার অর্থে এই কাঙ্খিত পদ্ধতির সুফল কতটুকু ভোগ করবেন তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কাঙ্খিত এই গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি কমবে সেটি যেমন কাম্য তদ্রুপ শিক্ষার্থীরা যাতে এর পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারে সেইটিও কাম্য। অন্যথায় এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।

কৃষিশিক্ষায় আগামী ৩০ নভেম্বর স্নাতক ১ম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার এই গুচ্ছ পদ্ধতির আওতায় রয়েছে দেশের ৭ টি কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বা এবারের ভর্তি পরীক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসন সংখ্যা মিলিয়ে সর্বমোট ৩৫৫৫ আসনের বিপরীতে পরীক্ষা দিতে পারবে আসন সংখ্যার সর্বোচ্চ ১০ গুণ অর্থাৎ ৩৫৫৫০ জন।

বিগত বছরগুলোতে কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক ১ম বর্ষে ভর্তির আবেদনের যোগ্যতায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) মোট জিপিএ ৯ চাওয়া হলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে জিপিএ অপেক্ষাকৃত কম থাকত। দেখা গেছে ২০১৮-১৯ স্নাতক শিক্ষাবর্ষে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মোট জিপিএ ৬, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৬.৫, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭.৫। এবছর গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মোট জিপিএ ’র ৪র্থ বিষয় বাদে ৭.০০। এতে যেসব শিক্ষার্থী ৭ এর কম জিপিএ নিয়ে যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ হত এবং কৃষিবিদ হওয়ায় স্বপ্ন দেখত তাঁরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাকৃবি ও বশেমুরকৃবি ছাড়া বাকী ৫ টিতে আগের বছরগুলোতে আবেদনকৃত যোগ্য সকল শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ থাকত। কিন্তু এবছর নতুন গুচ্ছ পদ্ধতির আওতায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সুযোগ রাখা হয়নি। যেখানে ৭টি কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই লক্ষাধিক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেত সেখানে মাত্র ৩৫৫৫০ জনকে (মোট আসনের ১০ গুন) সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আবেদনকৃত যোগ্য ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্র্থীদের আবেদন ফি নিয়ে তাদেরকে নৈতিকভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অপরদিকে জিপিএ ৭ নির্ধারণ করা হলেও শুধুমাত্র ১০ গুন শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্তে ৯ বা ১০ জিপিএ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। অর্থ্যাৎ ভর্তিচ্ছুদের আবেদনের যোগ্যতা কঠিন হওয়ায় বাকৃবি ছাড়া অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষাকৃত কম জিপিএ নিয়ে কৃষিবিদ হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাচ্ছে। উপরন্তু যে সমস্যাটি দেখা দিবে তা হল সামনের সারির (জিপিএ ৯ বা ১০ পাওয়া) এসব শিক্ষার্থী ওসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিকভাবে ভর্তি হলেও তাদের অধিকাংশ অন্যত্র ভাল কোথাও চলে যাবার অশংকা থাকবে ফলে আসন সংখ্যা খালি থেকে যাবে। যেখানে দেশে উচ্চশিক্ষায় আসন সংখ্যা সীমিত সেখানে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা কমিটির এহেন সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে যা নিঃসন্দেহে অনাকাঙ্খিত এবং রাষ্ট্রীয় অপচয়ের সামিল। যেখানে দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম সেখানে প্রতি সিটের বিপরীতে মাত্র ১০ জন লড়াই করবে, যেটা আসলেই স্বপ্নের মত অথচ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সিটের জন্য শতাধিক প্রার্থী লড়াই করে। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে থাকে। দ্বিতীয়বারের মত এই গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকলেও ১০ গুন বাছাই প্রক্রিয়ায় তারা সুযোগ পাবে না। সুতরাং সেখানে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকা আর না থাকা একই কথা। কৃষিভিত্তিক এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (বাকৃবি ও বশেমুরকৃবি বাদে) যদি বিগত বছরগুলোতে আবেদনকৃত যোগ্য সকল শিক্ষার্থীর জন্য ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করতে পারে তাহলে এবার সাত বিশ্ববিদ্যালয় সম্মিলিতভাবে কেন পারবে না এ প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলো যদি ভর্তিচ্ছু সকল প্রার্থীর জন্য ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করতে পারে তাহলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পারবে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের জিপিএর ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাই করে ১০০ নম্বরের (এমসিকিউ) ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে পুনরায় একই জিপিএ’র জন্য আরও ১০০ নম্বর রেখে প্রাথীর মুল্যায়ন কতটুকু যৌক্তিক তা ভেবে দেখার অনুরোধ পরীক্ষা কমিটির। কারণ এতে করে ভাল জিপিএ পাওয়া প্রার্থীরাই একই জিপিএ’র জন্য ডাবল বেনিফিট পাচ্ছে যা প্রকারন্তরে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার গুরুত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত কম জিপিএ প্রাপ্ত নতুন ও পুরাতন আবেদনকারীরা ভর্তি পরীক্ষায় ভাল করলেও চান্স না পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এর পরিবর্তে সরাসরি জিপিএ এর মাধ্যমে ভর্তির সুযোগ দিলে অন্ততপক্ষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতায়াত ভোগান্তিও খরচটুক কমে যেত এবং ভর্তিযুদ্ধের মানসিক চাপ থেকে শিক্ষার্থী বেঁচে যেত। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে বিষয়গুলো অনুধাবন করা দরকার।

ভর্তি পরীক্ষায় বঞ্চিতদের আবেদনের টাকাটি ফেরত দেয়া হবে কিনা তা উল্লেখ নেই বিজ্ঞপ্তিতে। বাকৃবিতে গতবছর বঞ্চিতদের টাকা ফেরত দিতে অনেক ভোগান্তি হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে এবছর গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিপুল সংখ্যক বঞ্চিতদের টাকা যদি ফেরত দিতে হয় তা অনেক ঝামেলাপূর্ণ হবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে। কারণ আবেদনকৃতদের কোন লিংক বা ব্যাংক একাউন্ট ভর্তি প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আবার যদি টাকাটি ফেরত না দেয়া হয় তাহলে যে বিষয়টি দাঁড়াবে সেটি হল, আগে যেখানে মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার আসন সংখ্যার ১০ গুন আবেদনকারীকে সুযোগ দিয়ে বাকীদের বঞ্চিত করে যে টাকা আদায় করত এখন এই গুচ্ছ পদ্ধতিতে আরও ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হওয়ায় মোটা অংকের টাকা আদায় হবে যা কোনভোবেই কাম্য নয়।

যাদের জিপিএ অপেক্ষাকৃত কম, তারা আসলেই তাদের যোগ্যতা প্রমানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা নির্বাচিত হচ্ছে, তারা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত হচ্ছে। উদাহারণস্বরুপ বলা যেতে পারে, একজন শিক্ষার্থী চতুর্থ বিষয় বাদে মাধ্যমিকে পেয়েছে ৪.৫ এবং উচ্চমাধ্যমিকে পেয়েছে ৪.২৫, গুচ্ছ পদ্ধতির এবারের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মধ্যে তার অর্জিত নম্বর হবে (৪.৫ x ৮ + ৪.২৫ x ১২) = ৮৭, অন্যদিকে চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে যে শিক্ষার্থীটি উভয় বিষয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে তার প্রাপ্ত নম্বর হবে ১০০। এতে উভয়ের নম্বরের পার্থক্য হচ্ছে ১৩ যা কিনা একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে লিখিত বা এমসিকিউ পরীক্ষায় মাধ্যমে পুষিয়ে নেয়া অনেক কঠিন। আবার নেগেটিভ মার্কিং বা ১ টি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কর্তন তো আছেই। চতুর্থ বিষয় যোগ করে কোন শিক্ষার্থীর যদি যে কোন একটি বা উভয় পরীক্ষায় জিপিএ ৫ হয় তাহলে এ বৈষম্য কমে যাচ্ছে বা থাকছে না। মাত্র একটি বা দুটি বিষয়ে গ্রেড কম বেশি হলে যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে তা শিক্ষার্থিটির ভর্তির ক্ষেত্রে মারাত্বক প্রভাব ফেলছে। অতএব জিপিএ এর ভিত্তিতে প্রাপ্ত নম্বরের পার্থক্য কমিয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা প্রমানের বা মূল্যায়নের সুযোগ দেয়া উচিত। এক্ষত্রে জিপিএ ভিত্তিতে প্রাপ্ত মোট নম্বর ১০০ থেকে কমিয়ে ২০ বা ৩০ করলে এই বৈষম্য কমিয়ে আসবে। অথবা পুরো নম্বর লিখিত বা এমসিকিউ পরীক্ষায় রাখা যেতে পারে।

জায়গা সংকুলান না হলে আবেদনকৃত সকল যোগ্য প্রার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে দুই শিফটে ৫০% করে আসন বন্টন করে ভিন্ন সেট প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে যেটি করছে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। অথবা আশে পাশের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চীন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিলসহ বিশ্বের অনেক দেশে আছে। প্রয়োজনে তাদের পদ্ধতিগত বিষয়গুলো দেখা যেতে পারে। ভর্তি পরীক্ষা কমিটিতে নিশ্চয়ই যারা আছেন তারা সমাজের আলোকিত মানুষ যারা জ্ঞান সৃষ্টি বিতরণ করেন। তাঁদের বুদ্ধি, বিবেক ও বিচক্ষণতার কাছে এসব শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বহুকাঙ্খিত এই গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় শুধু যাতায়াত ভোগান্তি নিরসন নয় এসব জটিলতা কাটিয়ে অতি দ্রুত সহজ ও অধিকতর কার্যকরী সমাধান আশা করেন।

লেখক: প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
ইমেইলঃ szaman@bau.edu.bd

(Visited 1 times, 1 visits today)