এক ‘কুঁচিয়ার গ্রাম’ নিয়ে গল্প

পার্থ শঙ্কর সাহা:
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সব্দলপুর গ্রামটির নাম পাল্টে গেছে। উপজেলা সদর থেকে আট কিলোমিটার পূর্বের গ্রামটির নাম এখন ‘কুঁচিয়ার গ্রাম’ হয়ে গেছে। এমন নাম হওয়াটা অমূলক না মোটেও। গ্রামের ১২৫ পরিবারকুঁচিয়া মাছের চাষের সঙ্গে যুক্ত। পিচ্ছিল, তেলতেলে ও আঁশবিহীন এ মাছ চাষে পরিবারগুলোর হাল ফিরেছে। ‘কুৎসিত’দর্শন প্রায় অপ্রচলিত মাছের চাষে সবল হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি।

২০১৫ সালে এসব গ্রামে কুঁচিয়ার চাষ শুরু। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংগঠন ‘উন্নয়ন ’ তাদের উপকারভোগীদের মাধ্যমে চাষ শুরু করে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ‘উদ্ভাবনীমূলক কৃষিজ উদ্যোগ’ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় মানুষকে ঋণ দেয় উন্নয়ন। সংগঠনটির কর্মকর্তা তারিকুর রহমান বলছিলেন, পরিবারপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। কাউকে কাউকে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। সমস্ত পরিবার প্রথম বছরেই তাদের ঋণের টাকা ফেরত দিয়েছে।

সব্দলপুর গ্রামের পাশেই উজিরপুর গ্রাম। আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এ গ্রামে এখন এক বিরাট বাজার বসে। কুঁচিয়ারই বাজার। এ দুই উপজেলা ছাড়াও জেলার অন্য উপজেলার কুঁচিয়া এখানে জড়ো হয়।

তালা উপজেলার প্রভাস মণ্ডল। পাঁচ বছর ধরে মাছ সংগ্রহ করে উজিরপুর বাজারে বিক্রি করেন। তিনি বলছিলেন, এখন প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। কুঁচিয়া চাষের সাফল্য কিন্তু দক্ষিণের এই প্রত্যন্ত এলাকাতেই আটকে নেই; শুধু পিকেএসএফই এখন দেশের ২১ জেলার ৩৩টি উপজেলায় কুঁচিয়া চাষে ঋণ দেয়।

পিকেএসএফের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দরিদ্র মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্যই কুচিয়া চাষে উৎসাহ দিচ্ছি আমরা। এর লক্ষ্য স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার।’

এক দশক ধরে বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়া চাষের শুরু। তবে গত পাঁচ বছরে এ চাষের পরিমাণ বাড়ছে। দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় এখন বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়ার চাষ হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত কুঁচিয়ার বেশির ভাগটাই রপ্তানি হচ্ছে। যাচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়ার ২৩টি দেশে। জ্যান্ত ও শুকনো—দুই ধরনের কুঁচিয়া যাচ্ছে দেশ থেকে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মুক্ত জলাশয়ে কুঁচিয়া উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৬ মেট্রিক টন। ২০১৬-১৭ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ মেট্রিক টনের বেশি। আর সব মিলিয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ১২ হাজার ৩৫৩ মেট্রিক টনের বেশি কুঁচিয়া উৎপাদিত হয়। ওই বছর বৈদেশিক মুদ্রা আসে ১৮৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে আরও ২০০ মেট্রিক টন বেশি উৎপাদিত হয়। আয় হয় ২০৪ কোটি ১ লাখ টাকা।

ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে কুঁচিয়ার চাহিদা প্রচুর। এ মাছের ঔষধিগুণও প্রচুর। রক্তশূন্যতা, অ্যাজমা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এ মাছের উপযোগিতা আছে। মৎস্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুঁচিয়ার রক্ত খেলে শারীরিক দুর্বলতা ও রক্তশূন্যতা কমে। প্রাকৃতিক পুকুর বা জলাশয় এবং বাড়িতে কংক্রিটের স্থাপনা বা ডিচ তৈরির মাধ্যমে দুভাবে কুঁচিয়ার চাষ হয়।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বেসরকারি সংগঠন হিড-বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে কুঁচিয়া চাষ হচ্ছে। সংগঠনটির কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, মাত্র ছয় মাসে ২০ কেজি কুঁচিয়া থেকে ২০ হাজার পোনা এবং ৫০ কেজি কুঁচিয়া উৎপাদিত হয়। এক কেজি কুঁচিয়ার বাজারমূল্য ৩০০ টাকার বেশি। চাষিরা মৌসুমে ২০ থেকে ৩০ হাজার এবং বাচ্চা কুঁচিয়া ১৫ টাকা দরে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি করছেন।

মিঠা ও লোনাপানি—এই দুই পানির কুঁচিয়া উৎপাদিত হয় দেশে। এর মধ্যে মিষ্টি কুঁচিয়ার দাম বেশি। কমলগঞ্জের এই কুঁচিয়া মিঠাপানির। তাই এর দাম বেশি। তবে লোনাপানির কুঁচিয়ার দাম কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা বলে ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে জানা গেছে।

রাজধানীর উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টরের কাছে নলভোগ এলাকায় কুঁচিয়া ও কাঁকড়ার বড় বাজার। প্রতিদিন সকাল সাতটায় এ বাজার বসে। বাজার থেকে এখন প্রতি সপ্তাহে ৩০০ টন কুঁচিয়া বিক্রি হয় বলে জানান বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলসিএফইএ) সভাপতি গাজী আবুল কাশেম।

বাংলাদেশের কৃষি বৈচিত্র্যময় হচ্ছে দিন দিন। কুঁচিয়ার এই সম্প্রসারণ এরই একটি নমুনা—এমনটাই মনে করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে এসব অপ্রচলিত চাষ ভূমিকা রাখছে। জমি ও পানির সদ্ব্যবহারেও এর ভূমিকা আছে। তবে এসব চাষের বিকাশে নীতি–সহায়তা দরকার।

 

সূত্র: প্রথম আলো

Comments

comments