জাপানের আত্মহত্যার বন ‘আওকিগাহারা’

ডেস্ক নিউজ:
প্রতিবছর অনেক মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে আত্মহত্যা করে ভাবতেই কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠে। হ্যাঁ এই রকম একটি স্থান জাপানে আছে। হনশু দ্বীপে অবস্থিত জাপানের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট ফুজির (১২ হাজার ৩৮৯ ফিট) উচু এই পাদদেশে রয়েছে সেই স্থান ‘আওকিগাহারা’ Aokigahara নামের একটি বন।

৩৫ বর্গ কিলোমিটারের এই বনটির অন্য নামও আছে। গাছপালার প্রাচুর্যের জন্য কেউ কেউ একে ‘বনের সমুদ্র’ বলে, কেউ বা বলে ‘শয়তানের বন’। তবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘আত্মহত্যার বন’ বলে। স্থানীয়দের কাছে এই বন জুকাই নামে পরিচিত।এখানে বন্য প্রাণীদের বসবাস নেই বললেই চলে সেজন্য অন্য সব বনের তুলনায় এটি একটু বেশিই নির্জন।

১৯৯৩ সালে জাপানি লেখক ওয়াতারু তসুরুমুইয়ের লেখা একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়, যার নাম ‘দ্য কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল’। বিতর্কিত বইটিতে আত্মহত্যার বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এ বইটিতে ‘আওকিগাহারা’ বন আত্মহত্যার একটি সঠিক স্থান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

এর আগে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত জাপানি লেখক সেইকো মাতসুমোতোর লেখা Kuroi Jukai (এর অর্থ ‘বৃক্ষের কৃষ্ণসাগর’) উপন্যাস আত্মহত্যার এসব ঘটনার পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে বলে মনে করা হয়। আওকিগাহারা বনে দুই প্রেমিক-প্রেমিকার আত্মহননের মধ্যে এই উপন্যাসের কাহিনি শেষ হয়।

অনেকে মনে করেন, বহুল পঠিত এই উপন্যাসটি যাঁরা পড়েছেন,তাঁদের মধ্যে এমন এক ছাপ ফেলেছে, পরবর্তিতে আত্মহননে প্ররোচিত হয়েছেন তাঁরা। জাপানে আত্মহত্যার প্রবণতা খুব বেশি, প্রতিবছর সে দেশে গড়ে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে।

প্রতি বছর এখানকার কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০টি মৃতদেহ উদ্ধার করে, আর বাকি মৃতদেহগুলো অনাবিষ্কৃত থেকে যায় বছরের পর বছর। এই বনটি পৃথিবীতে আত্মহত্যা করার যতগুলো স্থান আছে তার মধ্যে এই বনের অবস্থান দ্বিতীয়, প্রথম স্থানে গোল্ডেন গেট ব্রিজ।

প্রায় ৩৫ বর্গকিলোমিটারের এই বনের প্রবেশমুখে আত্মহত্যা প্রবন মানুষদের জন্যে একটি সতর্কবানী দেয়া আছে।এতে জাপানী ভাষায় লেখা আছে, “আপনার জীবন আপনার পিতা-মাতার দান করা অমুল্য উপহার।দয়া করে আপনার পিতা-মাতা,ভাই-বোন এবং সন্তানদের কথা ভাবুন।” “আপনার মনের কথা জমিয়ে রাখবেন না, সমস্যাগুলোর কথা আরেকজনের কাছে খুলে বলুন”। এরপর এতে ‘আত্মহত্যা-প্রতিরোধ সংস্থা’র ফোন নম্বর এবং যোগাযোগের ঠিকানা দেয়া আছে। তবে এতে খুব বেশী লাভ হয় না।

পরিসংখ্যান বলছে, এই বনে পাওয়া মৃতদেহের সংখ্যা একেক বছর একেক রকম। যেমন- ২০১০ সালে ১০৮ টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, যেখানে ২০০২ সালে পাওয়া যায় ৭৮টি মৃতদেহ। বেশ কয়েক বছর ধরে আত্মহত্যার পরিমান এতোই বেড়ে চলেছে যে, এখানকার কর্তৃপক্ষ পুলিশ টহল বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এতো বড় বনে টহল দিয়ে সবার আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

১৯৭০ সাল থেকে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও সাংবাদিকরা প্রতি বছর আওকিগাহারা বনে একবার করে মৃতদেহের সন্ধান করেন। নির্জন এই বনে ঢুকলে গা শিউরে ওঠাটা স্বাভাবিক। আর ভয় আরো বাড়িয়ে দেয় বনের ভেতরে এদিও ওদিক পরে থাকা আত্মহত্যা করা মানুষগুলোর জুতো, ব্যাগ, খেলনা পুতুল, কাপড়, ক্যাপ, ঘড়ি ইত্যাদি নিদর্শন।

অসংখ্য সাইনবোর্ড এবং গাছের ডালে লাগানো বা ঝোলানো কাগজ রয়েছে বনের ভেতরে।

সেসবের লেখাগুলো এমন- ‘আরেকবার চিন্তা করুন’, ‘পরিবারের কথা ভাবুন’, ‘ব্যর্থতাই জীবনের শেষ নয়’ ইত্যাদি। তবে সেগুলো উপেক্ষা করে প্রতি বছরই জীবন থেকে ছুটি নিতে অসংখ্য মানুষ এই বনে এসে জীবনের করুন সমাপ্তি টানে।

আজুসা হায়ানোর মতো একজন গবেষক ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে গবেষণা করে কোনো কিনারা করতে পারেননি। অনেক সময় মানুষের শেষ মুহূর্তের সঙ্গী পুতুল খুঁজে পাওয়া যায় বনটিতে।গাছের সঙ্গে পেরেক দিয়ে লাগানো পুতুল দিয়ে বোঝানো হয় প্রচলিত সমাজ ও এর মানুষের প্রতি ঘৃণা।

বিভিন্ন সময় অনেক মানুষকে দেখে মি. হায়ানো আত্মহত্যা না করার জন্য অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেন। তবে কেউ শোনে, কেউবা এড়িয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করে বলে মনে করেন।

সূত্র: ফেসবুক

(Visited 6 times, 1 visits today)