বাংলাদেশে পেঁয়াজ অর্থনীতির গতি প্রকৃতিঃ একটি পর্যালোচনা

ড. মোঃ সাইদুর রহমান:

পেঁয়াজ বাংলাদেশের মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর একটি অন্যতম খাদ্য উপকরণ। মজাদার খাদ্যদ্রব্য তৈরিতে রমজানের সময় এবং কুরবানির সময়ে পেঁয়াজ এক অপরিহার্য ব্যবহৃত পণ্য। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশে সারা বছর ২৪ লক্ষ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে দেশে মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ১৭.৩৮ লক্ষ মেট্রিক টন যা বিগত বছরে ছিল ১৮.৬৭ মেট্রিক টন। আর আমদানি করা হয় প্রায় ১১ লক্ষ মেট্রিক টন।

হিসাবে কিছুটা গড়মিল মনে হলেও পচনশীল পণ্য বিবেচনায় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কিছুটা বেশি রাখার চেষ্টা সংগত কারণেই খুব স্বাভাবিক। মূলত: পার্শবর্তী দেশ ভারত থেকেই সিংহভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়ে থাকে। মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক থেকেও কিছু পেঁয়াজ আমদানি করা হয়।

এবছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমদিকে ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাবার কারণে বাংলাদেশের বাজারেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কয়েকদিনের ব্যবধানেই কেজি প্রতি দাম ৪০-৪৫ টাকা থেকে ৫৫-৬০ টাকা হয়ে যায়। হঠাৎ করে ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব ট্রেড (ডিজিএফটি) ঘোষনা করেন যে, ভারত থেকে রপ্তানি করা পিয়াজের দাম টন প্রতি সর্বনিম্ন মূল্য হবে ৮৫০ ডলার যা পূর্বে ছিল ৩৫০ ডলার। পরবর্তীতে ভারত সরকার তাদের ভোক্তাদের চাহিদা অটুট রাখার স্বার্থে গত ২৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে পেঁয়াজ আর রপ্তানি করা হবে না বলে জানিয়ে দেয়। এমনকি পূর্বের অর্ডারও বাতিল কওে দেয়। এর সাথে যোগ হয়ছে কিছু সংখ্যক অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের অসাধু আচরণ। ফলে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। বিপাকে পড়ে লক্ষ লক্ষ ভোক্তারা। বাজার অস্থিতিশীল হওয়ায় সরকারও পেঁয়াজের বাজারের লাগাম ধরতে ব্যর্থ বলে তার তকমা নিতে হয়। মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারে সরকারের বানিজ্য মন্ত্রনালয়সহ নড়েচড়ে বসে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং প্রতিদিন ঢাকা শহরে ৫ টন করে পেঁয়াজ ৪৫ টাকা কেজি দরে খোলা বাজারে বিক্রির ঘোষণা দেয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২০০৭-০৮ সালে নিজস্ব ভোক্তাদের কথা বলে চাল নিয়ে ভারত একই কাজ করেছিল এবং ২০১৫ ও  ২০১৭ সালে পেঁয়াজ রপ্তানিতেও ভারত হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম দেশের এহেন বৈরি আচরণ এদেশের মানুষকে দারুণভাবে ব্যথিত করে। সাথে সাথে একথাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বেশি নির্ভরশীলতার সুযোগ যাতে কেউ না নিজে পারে তার জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।

মিয়ানমার, মিশর এবং তুরস্ক থেকে ১ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ এবং গত কয়েকদিনে জেলা প্রশাসন ও আইন শৃংখলা বাহিনীর উদ্যোগে বাজার তদারকির নামে অভিযান পরিচালনা করায় পেয়াজের ঝাঁজ কিছুটা কমে এসেছে। তাছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সাবমিটে যোগদানের পর ভারত-বাংলাদেশ ব্যবসায়ী ফোরমের অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানির খবর যথাসম্ভব পূর্বে বাংলাদেশকে জানানো হলে ভাল হতো বলে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত অভিমত ব্যক্ত করায় তার প্রভাব পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল হতে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্ভুত পরিস্থিতির সাময়িক সমাধানের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যদিও এগুলো কোন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়।

দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের নিমিত্তে যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তা হলো:

১। পেঁয়াজকে মসলা পণ্য হিসেবে ঘোষনা করে অন্যান্য মসলা পণ্যের ন্যায় ২ শতাশ হারে ঋণ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করলে কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহী হবে এবং এতে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে;

২। সঠিকভাবে পেঁয়াজের চাহিদা নিরূপণ করে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পেঁয়াজ উৎপাদনকরী একাধিক দেশ থেকে তা আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে;

৩। নিয়মিত বাজার তদারকির জন্য বানিজ্য মন্ত্রনালয়সহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকতে হবে;

৪। দেশীয় পেঁয়াজ সংরক্ষণের টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণায় বিনিয়োগসহ উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে;

৫। ব্যবসায়ীদেরকে শুধু দোষারোপ না করে তাঁদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে;

৬। কৃষক উৎপাদন মৌসুমে যেন ভাল দাম পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে;

৭। অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে বাজারে পেঁয়াজের যোগান বৃদ্ধি পেলে দাম কমে আসবে কিন্তু সে যোগান যেন কেউ বাঁধাগ্রস্থ না করতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিয়মিত তদারকি রাখতে হবে;

৮। দাম কিছুটা বাড়লেই খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা যেন বেশি মাত্রায় মজুত না করে তার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে; এবং
৯। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা যাতে না বাড়ে সেজন্য উৎপাদন মৌসুমে কম দামে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ রপ্তানির সুদূর-প্রসারি কৌশলকে মোকাবেলা করার সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকতে হবে।

________________________

ড. মোঃ সাইদুর রহমান

প্রফেসর, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

(Visited 1 times, 1 visits today)