অবহেলিত বুনো ফুল ধুতুরা

মো. আব্দুর রহমান, বাকৃবি:
বিশ্বে যতগুলো অপ্রিয় আর অবহেলিত বুনোফুল ফুল রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধুতুরা ফুল। ধুতুরা সাধারণ মানুষের কাছে বিষাক্ত ফুল হিসেবেই পরিচিত। পথে-ঘাটে, রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত স্থানে এই অবহেলিত ধুতুরা আপনা-আপনিই জন্মায়। তবে এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। ইদানিং শোভাবর্ধক হিসেবে বাগানেও শোভা পাচ্ছে।

ধুতুরা Solanaceae গোত্রের এক প্রকার উদ্ভিদ। বিজ্ঞানী লিনিয়াস এই গাছটি সম্পর্কে ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে একটি সাধারণ ব্যাখ্যা করেন এবং নামকরণ করেন Dutura metel। ধুতুরা ফুল আর এর বিষ সম্পর্কে কমবেশি আমরা সকলেই জানি। ফুল, গাছ, পাতা এমনকি ফল পর্যন্ত এর বিষাক্ত। বাংলাদেশের অজ্ঞান পার্টির লোকেরা এর ফলটাকে ব্যবহার করে ওদের হাতিয়ার হিসেবে। বিষাক্ত ফুল হিসেবে এর কুখ্যাতি দুনিয়া জোড়া। ইংরেজিতে এর আরেক নাম Devil’s Trumpet

এই গাছ উচ্চতায় প্রায় ২-৬ ফুট হয়। এর কান্ড কোমল, গোলাকার মসৃণ এবং সবুজ। এর পাতাগুলো সরল। পাতার বিন্যাস একান্তর। এর পাতা ডিম্বাকার এবং জালিকা শিরাযুক্ত। পাতাগুলো ৭ ইঞ্চি লম্বা এবং ৪ ইঞ্চি চওড়া। এই গাছের ফুল এককভাবে ফোটে। এর ফুল সম্পূর্ণ, আকারে বড় এবং রঙ সাদা। ফুলগুলো লম্বায় প্রায় ৩-৬ ইঞ্চি হয়ে থাকে। ফুলে বৃত্তাংশ ৫টি যুক্তাবস্থায় থাকে। ফুলের পাপড়ি সংখ্যা ৫টি। এর পাপড়িগুলো সংযুক্ত হয়ে একটি ফানেলের আকার তৈরি করে। ফুলের পুংকেশর থাকে এবং পাপড়ির সাথে যুক্ত থাকে। পরাগধানীগুলো বেশ লম্বা হয়। এর গর্ভপত্র সংখ্যা ২টি। এর অমরা স্ফীত এবং মাতৃ-অক্ষের সাথে তীর্যকভাবে যুক্ত থাকে। এর ফল গোলাকার, গায়ে কাঁটা থাকে। ফলের রঙ ফিকে সবুজ। এর বীজ লঙ্কা বীজের মতো।

Dhutura Pic4

রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত স্থানে জন্মানো অবহেলিত ধুতুরা ফুল

অপ্রিয় আর অবহেলিত হলেও ধুতুরা ফুলের রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। চৈনিক ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্রে বর্ণিত পঞ্চাশটি প্রধান উদ্ভিদের একটি এই ধুতুরা। প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতার এক মৃৎ পাত্রে ধুতুরা ফুলের নিদর্শন পাওয়া যায়। চীনের সম্রাট সেন নুং চার হাজার বছর আগেই ধুতুরার গুনাগুন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। নানা ধরনের গুনাগুণের জন্য এর বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে, যেমন- ধুস্তর, কিতব, মাতুলক, মদন, শিবশেখর, কণ্টফল, মোহন, কলভোন্মত্ত, শৈব ইত্যাদি। ধুতুরা গাছে আছে ট্রোপেন অ্যাকোলয়েডস আর বীজে আছে ডাটুরানোলোন। এসব উপাদান থাকার ফলে এই ফুল বিষাক্ত, অধিক সেবনে মস্তিষ্কের বিকৃতি এমনকি এই গাছের বিষক্রিয়ায় মানুষ বা পশুপাখির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর বহু লোক ধুতুরা বিষে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এই কারণে অনেক দেশেই ধুতুরার উৎপাদন, বিপনণ ও বহন আইনত নিষিদ্ধ।

এই গাছ সাধারণভাবে বিষাক্ত হিসাবে পরিচিত হলেও আয়ুর্বেদ ও ভেষজ চিকিৎসায় এই গাছের পাতা ফল, মূল ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ধুতুরার বীজ থেকে চেতনানাশক পদার্থ তৈরি করা হয়। কুকুরের কামড়ের বিষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ধুতুরা গাছের মুলের রস পান করানোর বিধান আছে। এর পাতার রস কৃমি নাশক। অতিরিক্ত খাওয়ার জন্য অস্বস্তি হলে এর বীজ খাওয়ার বিধান দেওয়া হয়। স্তনের ব্যাথা প্রশমনে ধুতুরা পাতার প্রলেপ মাখানোর বিধান আছে। এছাড়া হিন্দুরা ধুতুরা ফুল শিব পূজায় ব্যবহার করে থাকে।

প্রচলিত ভাষায় ধুতুরা ফুলকে র্দুভাগ্যের প্রতীক বলা হয়। মৃদু সৌরভ আর সাদা রংয়ের পদ্ম ফুলের মত দেখতে এ ফুলের দর্শন সাধারণ মানুয়ের কাছে অপ্রিয় হলেও প্রায় দূর্লভ ফুল হিসাবে ফুলের চির স্নিগ্ধতা, শুভ্র-পবিত্র রূপ প্রকাশের ক্ষেত্রে কারো দ্বিমত থাকে না।

______________________________________________________
লেখক:
শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।
ফেসবুক: Abdûr Rähmän

Comments

comments